অনাক্রম্যতা

রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা : ইমিউনিটি হচ্ছে মানবদেহে একটি পরিপূর্ণ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, যা বহিরাগত যে কোন ক্ষতিকর পদার্থসমূহকে সনাক্ত করে সেগুলোকে দেহ থেকে বহিষ্কার করতে কিংবা ধ্বংস করে ফেলতে পারে। এই প্রক্রিয়াগুলো যদিও সাধারণত দেহের জন্য উপকারী কিন্তু কোন কোন সময় অধিকমাত্রায় ক্রিয়াশীল হলে দেহের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। কারণ এই ক্ষমতা তার ভারসম্য হারিয়ে ফেললে দেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদানসমূহকে ধ্বংস করতে গিয়ে দেহের জন্য দরকারী এবং উপকারী উপাদানসমূহকে ধ্বংস করে দেহে জটিল রোগের সৃষ্টি করে থাকে। এই রকম ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার নাম হচ্ছে স্বঅনাক্রম্যতা বা অটোইমিউনিটি এবং অতিসংবেদনশীলতা বা হাইপারসেন্সিটিভিটি।

ইমিউনিটি বা  রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার শ্রেণীভেদ:
ইমিউনিটি দুই প্রকার যথা-
(১) ইননেট বা ইনবর্ন ইমিউনিটি (জন্মগতভাবে প্রাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা) : এরকম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা মাতৃগর্ভে থাকার সময় জন্ম নেয়। এরকম প্রতিরোধ ব্যবস্থা কোন নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে ক্রিয়াশীল নয়। কোন জীবাণুর সঙ্গে পরিচয় ঘটার আগে থেকেই এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্রিয়াশীল থাকে।   
(২) এ্যাকোয়্যার্ড বা অর্জিত প্রতিরোধ ক্ষমতাঃ এরকম প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মের পর কোন জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার পর সৃষ্টি হয়। এবং একই জীবাণু দ্বারা বারবার সংক্রমিত হওয়ার ফলে অধিকতর শক্তিশালী হয়। এই ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট এক বা একাধিক পরিচিত জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে।

এ দু’টির প্রত্যেকটিকে আবার ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক এবং আর্টিফিসিয়াল বা কৃত্রিম এই দুই ভাগে বিভক্ত।

এই অর্জিত প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আবার এ্যাকটিভ বা প্রত্যক্ষ এবং প্যাসিভ বা পরোক্ষ এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়।
(২/ক) একটিভ ইমিউনিটি বা প্রত্যক্ষ অনাক্রম্যতাঃ এধরনের অনাক্রম্যতার ক্ষেত্রে দেহের রোগপ্রতিরোধ করতে সক্ষম শ্বেতকণিকাসমূহ প্রত্যক্ষভাবে জীবাণুকে ধ্বংসের কাজে নিয়োজিত থাকে। এদেরকে দুইভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা-
(a)  ন্যাচারাল একটিভ ইমিউনিটি বা প্রাকৃতিক প্রত্যক্ষ অনাক্রম্যতা : দেহে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটলে যে প্রতিরোধ ক্ষমতার সৃষ্টি হয় তার নাম প্রাকৃতিক প্রত্যক্ষ অনাক্রম্যতা। যেমন- জল বসন্ত বা গুটি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার পর যে প্রতিরোধ ক্ষমতার সৃষ্টি হয় তা এই শ্রেণীভুক্ত।

(b) আর্টিফিসিয়াল একটিভ ইমিউনিটি বা কৃত্রিম প্রত্যক্ষ অনাক্রম্যতা :  টিকার দ্বারা কৃত্রিমভাবে রোগের সংক্রমণ ঘটিয়ে যে প্রতিরোধ ক্ষমতার সৃষ্টি করা হয় তার নাম কৃত্রিম প্রত্যক্ষ অনাক্রম্যতা। যেমন-গুটি বসন্তের টিকার দ্বারা গুটি বসন্তের বিরুদ্ধে যে কৃত্রিম প্রতিরোধ ক্ষমতার সৃষ্টি করা হয় তা এই শ্রেণীভুক্ত। একইভাবে ডিপিটি টিকার দ্বারা ডিপথিরিয়া, পার্টুসিস বা হুপিংকাশি এবং টিটেনাস বা ধনুষ্টংকার রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করার জন্য যে টিকা দেওয়া হয় তাকে কৃত্রিম বা আর্টিফিসিয়াল একটিভ ইমিউনিটি বলে
(২/খ) প্যাসিভ ইমিউনিটি বা পরোক্ষ অনাক্রম্যতা : এধরনের অনাক্রম্যতার ক্ষেত্রে দেহের বাইরে অন্যকোন মাধ্যমের ভিতর শ্বেতকণিকা দ্বারা সৃষ্ট এন্টিবডিসমূহকে কোন ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করিয়ে একটি নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতার সৃষ্টি করা হয়। এদেরকে দুইভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা-
(a)    ন্যাচারাল প্যাসিভ ইমিউনিটি বা প্রাকৃতিক পরোক্ষ অনাক্রম্যতা :  ভ্রুণ অবস্থায় মাতৃগর্ভে থাকার সময় প্লাসেন্টা বা গর্ভফুলের মাধ্যমে সরবরাহকৃত IgG  নামক এন্টিবডির দ্বারা এবং জন্মের পর স্তন্য দুগ্ধপানের সময় IgA নামক এন্টিবডির দ্বারা সৃষ্ট প্রতিরোধ ক্ষমতা এই শ্রেণীভুক্ত। যে ক্ষমতা শিশুর জন্মের পর ছয় মাস পর্যন্ত বজায় থাকে।
(b)    আর্টিফিসিয়াল প্যাসিভ ইমিউনিটি বা কৃত্রিম পরোক্ষ অনাক্রম্যতা : অন্য কোন প্রানীর দেহে কৃত্রিমভাবে এন্টিবডি তৈরী করে তাকে কোন ব্যক্তির দেহে সরবরাহ করে  যে প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করা হয় তা এই শ্রেনীভুক্ত। যেমন- ধনুষ্টংকার  বা টিটেনাস এর জন্য এটিএস (এন্টি টিটেনাস সিরাম) এবং টিআইজি (টিটেনাস ইমিউনোগ্লোবিউলিন), ডিফথিরিয়ার জন্য এডিএস (এন্টিডিফথিরিয়া সিরাম)।
শ্বেতকণিকার ধরনের উপর নির্ভর করে প্রত্যক্ষ অনাক্রম্যতাকে আবার দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়, যথা-
কোষ নির্ভর অনাক্রম্যতা বা সেল মিডিয়েটেড ইমিউনিটি (সিএমআই) দেহের টি সেল এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে থাকে এবং রসনির্ভর অনাক্রম্যতা বা হিউমোরাল ইমিউনিটি (এইচ আই) দেহের বি সেল এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে থাকে।

ইমিউনিটি বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার উপকারীতা :
১.    কতিপয় সংক্রামক রোগের আক্রমণের দ্বারা ঐসকল রোগজীবাণুর  বিরুদ্ধে আজীবনের জন্য রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার সৃষ্টি হয়। যেমন-  হাম, জল বসন্ত, গুটি বসন্ত, ইত্যাদি।
২.    টিকার দ্বারা কৃত্রিমভাবে কতিপয় রোগের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্ম হয়। যথা- ডিপথিরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুস্টংকার ইত্যাদি।

ইমিউনিটি বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অপকারীতা :
রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা মানবদেহকে সকলপ্রকার রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে থাকে। কিন্তু এই কাজটি করার জন্য শ্বেতকণিকা নামক যে সূক্ষ্ম রক্ষীবাহিনী জীবাণু ধ্বংসের কাজটি সম্পাদন করে থাকে তার মধ্যে একটু তারতম্য হলেই কিছু ক্ষতিকর রোগের সৃষ্টি হয় যেমন-
(১) হাইপারসেন্সিটিভিটি রিএ্যাকশন জনিত রোগ যথা- এ্যাজমা বা হাপানি, রিউমেটিক ফিভার বা বাত জ্বর, গ্লোমেরিউলোনেফ্রাইটিস ইত্যাদি।
(২) অটোইমিউন জাতীয় রোগ যথা- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, এসএলই, অটোইমিউন হেমোলাইটিক এ্যানিমিয়া ইত্যাদি।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s