প্রাচীন চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিতর্কিত নীতিমালাসমূহের আধুনিকায়ন

(ক) হোমিওপ্যাথিতে ব্যবহৃত পোটেনটাইজেশন বা শক্তিবৃদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার সংশোধিত ব্যাখ্যা
(খ) টিকাদান পদ্ধতি এবং হোমিওপ্যাথিক আরোগ্য পদ্ধতির পার্থক্য
(গ) আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নিকট গ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশ্যে হোমিওপ্যাথিতে প্রচলিত লক্ষণসাদৃশ্যের দ্বারা ওষুধ
বাছাইকরণ এবং অসংক্রামক রোগের আরোগ্য সাধন প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা

(ক) হোমিওপ্যাথিতে ব্যবহৃত পোটেনটাইজেশন বা শক্তিবৃদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার সংশোধিত ব্যাখ্যা ঃ হোমিওপ্যাথি শাস্ত্রে ব্যবহৃত পোটেনটাইজেশন বা শক্তিবৃদ্ধিকরণ কথাটি দীর্ঘদিন যাবত সমালোচিত এবং বিতর্কিত হয়ে এসেছে। মূল ওষুধকে এ্যালকোহল বা ল্যাকটোজের সঙ্গে মিশিয়ে ওষুধের পরিমাণ কমালে ওষুধের শক্তি বৃদ্ধি হয় একথাটা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি লাভ করেনি। অর্থাৎ ডাইলিউশন বা এ্যাটেনুয়েশন কখনো ওষুধের শক্তি বৃদ্ধি করতে পারেনা । এর একটি প্রকৃত গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আমরা ইমিউনোলজি বিজ্ঞানে ব্যবহৃত এ্যাটেনুয়েশন প্রক্রিয়া থেকে পেতে পারি । টিকায় ব্যবহৃত জীবাণু এবং জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট বিষাক্ত উপাদান দেহে বেশী মাত্রায় প্রবিষ্ট করলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হতে পারে ।

এ ব্যাপারে ভেষজ কিংবা জীবাণুজ যে কোন উপাদান একই রকম প্রকৃতি বিশিষ্ট। টিকাতে ব্যবহৃত বিষাক্ত উপাদানের উদ্দেশ্য হচ্ছে দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রকৃত রোগের আক্রমণের পূর্বেই হুঁশিয়ার করে দেয়া যাতে আক্রান্ত হলে রোগপ্রতিরোধ বাহিনী জীবাণুর আক্রমণকে বিলম্ব না করে প্রতিহত করতে পারে। হোমিওপ্যাথিতে ব্যবহৃত বিবিধ বিষাক্ত উপাদানের দ্বারা মূলতঃ একই কাজ একটু ভিন্নভাবে সম্পাদন করা হয়। যে কোন বিষাক্ত উপাদান যদি মুখে খাইয়ে বেশী পরিমানে দেহে প্রবিষ্ট করানো হয় তাহলেও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে । একটি বিষাক্ত উপাদান যত তাড়াতাড়ি তার কাজ শেষ করে লিভার এবং কিডনির সাহায্যে দেহ থেকে বের হয়ে যায় ততই দেহের জন্য মঙ্গল। সুতরাং ওষুধে ব্যবহৃত যে কোন বিষাক্ত উপাদানকে অল্পমাত্রায় ব্যবহার করার জন্য আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ্যাটেনুয়েশন বা লঘুকরণ পদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়েছে। হোমিওপ্যাথির জন্মের সময় বিজ্ঞানী হ্যানিম্যান মূল ওষুধ প্রয়োগ করে রোগীর রোগকষ্টের বৃদ্ধি দেখে ওষুধের মাত্রাকে ডাইলিউশন প্রক্রিয়ার সাহায্যে কমিয়ে ব্যবহার করার নির্দেশ দেন।

ওষুধের সূক্ষ্মমাত্রায় ব্যবহারের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিষাক্ত উপাদান বেশী মাত্রায় মুখে খাইয়ে প্রয়োগ করলে শরীর তাকে সহজে সনাক্ত করতে পারে এবং দেহের গভীরে প্রবেশ করার পূর্বেই দেহের বর্জ্য নিঃসরণ প্রক্রিয়া দ্রুতবেগে বিষাক্ত উপাদান সমূহকে দেহ থেকে দূরীভূত করে থাকে। ডায়ারিয়ার রোগীকে বিশুদ্ধ পানিতে অধিক পরিমাণে লবণ গুলে দ্রবণ তৈরী করে সেবন করালে, দেহ তা গ্রহণ করতে চায় না এবং ডায়ারিয়ার তীব্রতা বেড়ে যায় । অথচ সেই মিশ্রণকে অধিক পানিতে মিশিয়ে লবনের ঘনত্ব কমিয়ে সাথে চিনি এবং চালের গুড়া মিশিয়ে সুস্বাদু করে দিলে শরীর তা অতি সহজে গ্রহণ করে থাকে। এটাই হচ্ছে ওরস্যালাইন আবিষ্কারের মূল সূত্র । সূক্ষ্মমাত্রায় সুস্বাদু করে মুখে খাইয়ে প্রয়োগ করলে যে কোন ভেষজের মত বিষাক্ত উপাদান অতি সহজে দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে দেহের গভীরে প্রবেশ করে এমন স্থানে পৌঁছুতে পারে যেখান থেকে দেহের সকল জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়ে থাকে । হোমিওপ্যাথিক ওষুধে ব্যবহৃত, দেহের জন্য বিষাক্ত ভেষজের মাত্রাকে সুস্বাদু করে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতরভাবে প্রয়োগ করলে ওষুধের আরোগ্য ক্ষমতা গভীর থেকে গভীরতর হয়ে থাকে, এই বিষয়টি এমপিরিক্যাল বা পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই বিষয়টিকেই সম্ভবতঃ হোমিওপ্যাথিতে শক্তিকরণ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।

(খ) টিকাদান পদ্ধতি এবং হোমিওপ্যাথিক আরোগ্য পদ্ধতির পার্থক্য ঃ টিকাদান পদ্ধতিতে আক্রমণের পূর্বেই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। টিকার সাহায্যে এযাবৎ কোন রোগ আরোগ্য করা সম্ভব হয়নি। যদিও টিকায় ব্যবহৃত উপাদান এবং হোমিওপ্যাথিতে ব্যবহৃত উপাদান বিষাক্তধর্র্র্মী। উভয়ই অধিকমাত্রায় প্রয়োগ করলে সুস্থ দেহে রোগ উৎপাদান করে থাকে। হোমিওপ্যাথি শাস্ত্র তাদের আরোগ্য নীতিমালাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রোগশক্তি, জীবনীশক্তি এবং ওষুধশক্তি নামে তিনটি কাল্পনিক শক্তির অবতারণা করেছেন যে ব্যাখ্যা চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দ্বারা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা আজ জীবনীশক্তির পরিবর্তে ইমিউন সিস্টেম বা রোগপ্রতিরোধ বাহিনী দ্বারা পরিচালিত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্তিত্বের সন্ধান পেয়েছি। এর পাশাপাশি আমরা জানতে পেরেছি যে, পূর্ববর্তী একটি অণুচ্ছেদে বর্ণিত এইচ,এল,এ’র প্রভাবে সৃষ্ট ইমিউন টলারেন্স এর কারণে সৃষ্ট রোগপ্রবণতা জনিত জটিল সব রোগের উৎপত্তির তথ্য।
ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের বিকাশের পূর্বে হোমিওপ্যাথি শাস্ত্রে বর্ণিত সোরা, সাইকোসিস এবং সিফিলিস এই তিন প্রকার ‘মায়াজম’ নামক কাল্পনিক রোগ প্রবণতা সৃষ্টিকারী রক্তের দোষ দ্বারা সম্ভবতঃ হ্যানিম্যান এইচ, এল, এ কে বুঝাতে চেয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এইচ, এল, এ নামক জন্মগতভাবে প্রাপ্ত রোগবিষের ছত্রছায়ায় যে সকল বহিরাগত জীবাণু কিংবা ভাইরাস অথবা প্রাণহীন বিষেরা মানবদেহে নানাবিধ রোগলক্ষণ সৃষ্টি করে থাকে, তাদের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ বাহিনীকে উত্তেজিত করার জন্যই সম্ভবতঃ ওষুধ নামক প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত কৃত্রিম রোগলক্ষণ সৃষ্টিকারী উপাদান সমুহকে বাছাই করে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। হোমিওপ্যাথি তথা সমগ্র প্রাকৃতিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে ওষুধ হিসাবে বিষাক্ত উপাদানের ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে ইমিউনোলজির জ্ঞান দ্বারা এভাবে ব্যাখ্যা করলে সম্ভবতঃ চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি পাবে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, আজ পর্যন্ত কোন চিকিৎসা বিজ্ঞানই  রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিষাক্ত রোগ উৎপাদক গুণ সম্পন্ন ভেষজের ব্যবহারের সঠিক কারণ ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়নি। কেবলমাত্র ইমিউনোলজি বিজ্ঞানী ডাঃ জুলস্ টি ফ্রয়েন্ডের এ্যাডজুভ্যান্ট বা উদ্দীপক আবিষ্কারের পর আমরা বিষয়টির প্রকৃত ব্যাখ্যা জানতে পেরেছি।
এ্যালোপ্যাথি শাস্ত্রে গনোরিয়া এবং সিফিলিস রোগের কোন টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি কারণ এ দুটি রোগের জীবাণূকে মানবদেহের বাইরে কোনও মাধ্যমের ভিতর কৃত্রিমভাবে কালচার বা চাষ করা সম্ভব হয়নি। হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞানীরা এ দুটি রোগের জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট রোগবিষ বা টক্সয়েডকে রোগীদের দেহ থেকে সংগ্রহ করে মুখে খাইয়ে রোগীদের উপর সূক্ষ্মমাত্রায় ব্যবহার করার পদ্ধতি আবিষ্কার এবং প্রচলন করেছেন। যার দ্বারা বিগত এক শতাব্দি যাবত বিশ্বের শতশত হোমিও চিকিৎসকেরা হাঁপানি, কুষ্ঠ, বন্ধ্যাত্ব, জন্মগতভাবে প্রাপ্ত শত শত রোগ, আর্থ্রাইটিস বা সন্ধিবাত, নানাবিধ যৌন ব্যাধি, এমনকি অত্যন্ত দূরারোগ্য হৃদযন্ত্রের পীড়া থেকে রোগীদেরকে মুক্ত করে আসছেন যার কোন আরোগ্যকর চিকিৎসার উদাহরণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে একেবারেই নেই।
ঠিক তেমনিভাবে ক্যান্সার রোগ দ্বারা সৃষ্ট রোগবিষকে কৃত্রিমভাবে মানবদেহের বাইরে কালচার বা চাষ করা সম্ভব হয়নি। অথচ হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞানীরা নানা প্রকার ক্যান্সার দ্বারা মানবদেহে সৃষ্ট ক্ষত থেকে নিঃসৃত রস থেকে তৈরী রোগবিষ সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াজাত করে মুখে খাইয়ে নানা প্রকার ক্যান্সার জাতীয় রোগপ্রবণতা থেকে রোগীদেরকে মুক্ত করে চলেছেন। একইভাবে যক্ষ্মা রোগ দ্বারা আক্রান্ত মানবদেহ এবং গরুর শরীর থেকে রস সংগ্রহ করে মুখে খাওয়ানোর উপযোগী সূক্ষ্ম মাত্রার টক্সয়েড আবিষ্কার করেছেন, যার ব্যবহারের দ্বারা অত্যন্ত জটিল রোগ যেমন, শরীরের বিভিন্ন অংগের যথা- অস্থির, অন্ত্রের, মস্তিষ্কের যক্ষ্মা রোগ যা সহজে কোন পরীক্ষাতেই ধরা পড়েনা এবং ৬/৯ মাস মেয়াদী যক্ষ্মা রোগ আরোগ্যের ওষুধ (মাল্টিড্রাগ থেরাপি) ব্যবহার করেও যার কোন আরোগ্য সাধিত হয় না, এছাড়া অস্টিওমাইলাইটিস এবং গ্লোমেরিউলোনেফ্রাইটিস নামক অটোইমিউন রোগ, এমনকি নানাবিধ ক্যান্সার রোগের প্রাথমিক অবস্থায় অত্যন্ত সাফল্যের সাথে আরোগ্য করে আসছেন। অথচ অতি সম্প্রতি জাপানে মুত্রথলির ক্যান্সার চিকিৎসায় বি সি জি নামক যক্ষ্মা রোগের জীবাণু দ্বারা তৈরী টিকাকে স্থূলমাত্রায় সরাসরি মুত্রনালী দিয়ে প্রবেশ করিয়ে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক একটি চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচলন হয়েছে যা এখনো পুরোপুরি সাফল্যের মুখ দেখতে পারেনি। এর দ্বারা একটা বিষয় পরিষ্কার বুঝা যায় যে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ বা ইমিউনোমডুলেশন করার কাজে রোগবিষের সূক্ষ্মমাত্রার ব্যবহার স্থূলমাত্রার চাইতে অনেক বেশী কার্যকর।

(গ) আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নিকট গ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশ্যে হোমিওপ্যাথিতে প্রচলিত ‘লক্ষণসাদৃশ্যের দ্বারা ওষুধ বাছাইকরণ’ এবং অসংক্রামক রোগের আরোগ্য সাধন প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা ঃ আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী একজন সুস্থ মানুষকে ধুতরা বিষ দিয়ে উন্মাদ করা যায়, আবার সেই ধুতরা বিষ দিয়ে উন্মাদ রোগীকে আরোগ্য করা হয় (সূত্র ঃ চিরঞ্জীব বনৌষধি, পৃঃ ২৮১, প্রথম খন্ড)। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, যে বিষ একজন সুস্থ ব্যক্তিকে উন্মাদ করতে পারে, সেই বিষই একজন উন্মাদ রোগীকে আরোগ্য করতে পারে।
সুস্থ ব্যাক্তিকে ভেষজ সেবন করিয়ে কৃত্রিম রোগ উৎপাদন করার এই ক্ষমতাকে বিশদভাবে পরীক্ষা করে তার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞান। হোমিও বিজ্ঞানীরা আধুনিক ইমিউনোলজির জ্ঞান ছাড়াই হাইপোথেটিক্যালি বা কল্পনার আশ্রয় নিয়ে অসংক্রামক রোগ চিকিৎসার এক পদ্ধতির প্রচলন করেছিলেন। হোমিও আরোগ্য নীতিকে হোমিও বিজ্ঞানীদের নিজস্ব ভাষায় ব্যাখ্যা না করে আধুনিক ইমিউনোলজির ভাষায় ব্যাখ্যা করলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে নিম্নরূপ ঃ
একজন প্রাকৃতিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির দেহে যে সকল রোগ লক্ষণ দেখা যায় সেগুলি হচ্ছে প্রাকৃতিক রোগলক্ষণ, আর একজন সুস্থ ব্যক্তিকে ভেষজ পদার্থ সেবন করিয়ে যে রোগলক্ষণ সৃষ্টি করা যায়, তা হচ্ছে কৃত্রিম রোগ লক্ষণ। প্রাকৃতিক রোগ লক্ষণের জন্য দায়ী হচ্ছে জীবাণু বা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট ন্যাচারাল এ্যান্টিজেন বা প্রাকৃতিক রোগবিষ আর কৃত্রিম রোগলক্ষণের জন্য দায়ী হচ্ছে মেডিসিনাল টক্সিন বা ভেষজ বিষ। প্রাকৃতিক রোগলক্ষণ এবং কৃত্রিম রোগলক্ষণের মধ্যে সাদৃশ্য বিচার করে ভেষজ বিষটিকে বাছাই করতে হয়। এবার বাছাই করা ভেষজ বিষকে অতি অল্প পরিমাণে অসুস্থ ব্যক্তিকে মুখে খাইয়ে দিলে রোগীর দেহের রোগপ্রতিরোধ বাহিনী উদ্দীপিত হয়ে উঠে এবং মুখে খাওয়ানো ভেষজ বিষকে ধ্বংস করতে গিয়ে দেহে বিদ্যমান অনুরূপ রোগবিষ সমূহকে ধ্বংস করে ফেলে। যার ফলে রোগী রোগমুক্ত হয়।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ভেষজ শব্দটির অর্থ হচ্ছে যাহা রোগকে জয় করে অর্থাৎ ওষুধ। যে সকল উপাদান রোগকে আরোগ্য করতে পারে সেগুলোকেই ভেষজ বলা হয়। কিন্তু ভেষজকে ভেষজবিষ বলার পিছনে যুক্তি হচ্ছে যে, যে উপাদান একজন সুস্থ মানব দেহে কৃত্রিম রোগ লক্ষণ সৃষ্টি করতে পারে সেই উপাদান নিঃসন্দেহে মানবদেহের জন্য বিষতুল্য। এহেন বিষাক্ত গুণাগুণ ব্যতীত কোন উপাদান মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ বাহিনীকে উদ্দীপিত করার মত ক্ষমতার অধিকারী হতে পারবে না।
সুতরাং মানবদেহের প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত রোগবিষকে দেহ থেকে রোগপ্রতিরোধ বাহিনীর সাহায্যে নির্মূল করে দেহকে রোগমুক্ত করতে সক্ষম যে কোন পদার্থের ভিতরে বিষাক্ত গুণাগুণ থাকা অপরিহার্য। তাই ঔষধকে ‘ভেষজবিষ’ বা উদ্দীপক বিষ নামে আখ্যায়িত করার দ্বারা ঔষধের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা হয়েছে। হোমিও পদ্ধতিতে এরূপ ভেষজ উপাদান উদ্ভিজ্জ, প্রাণীজ, খনিজ, রোগজীবাণুজাত এবং তেজষ্ক্রীয় পদার্থের উৎস থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে, যার সঙ্গে ইমিউনোলজি বিজ্ঞানী ফ্রয়েন্ডের এ্যাডজুভ্যান্ট বা উদ্দীপকের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।
আয়ূর্বেদ শাস্ত্রের ন্যায় হোমিওপ্যাথি শাস্ত্রেও ধূতরা বিষ দ্বারা উন্মাদ রোগের চিকিৎসা করা হয়। যেহেতু ধূতরা বিষ দ্বারা সকল প্রকারের উন্মাদ রোগ আরোগ্য করা যায় না, সেহেতু ধূতরা বিষকেও বিসিজি টিকার দ্বারা ক্যান্সার চিকিৎসার মত অনির্দিষ্ট উত্তেজক বলে পরিগণিত করা যেতে পারে। কারণ বিসিজি টীকার দ্বারা পরীক্ষিত প্রতিটি ক্যান্সার রোগীকে যেমন আরোগ্য করা সম্ভব হয়নি, ঠিক তেমনি ধূতরা বিষ দ্বারাও প্রতিটি উন্মাদ রোগীকে আরোগ্য করা সম্ভব হয়নি। অথচ বিসিজি টীকা যক্ষ্মারোগের বেলায় একটি স্পেসিফিক বা সুনির্দিষ্ট উত্তেজক হিসাবে কাজ করে। কারণ বিসিজি টিকা গ্রহণকারী ব্যক্তিদের প্রায় ১০০% ক্ষেত্রে যক্ষ্মারোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, একটি উদ্দীপক কোন না কোন রোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট উদ্দীপকের ভূমিকা পালন করতে পারে। আয়ূর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী একটি মাত্র প্রধান লক্ষণের উপর ভিত্তি করে উদ্দীপক বাছাই করলে সেই উদ্দেশ্য সাধিত হয় না।
নিম্নবর্ণিত পদ্ধতিতে এই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করলেন হোমিও বিজ্ঞানীরা। ধূতরা বিষ বা ষ্ট্র্যামোনিয়াম দিয়ে উন্মাদ রোগের চিকিৎসায় ব্যর্থতার হার কমানোর লক্ষ্যে এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রচেষ্টা চালালেন তারা।
কি ধরনের উন্মাদ রোগীর বেলায় ধূতরা বিষ ১০০% ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করবে তার সঠিক তথ্যটি নির্ধারণ করতে চেষ্টা করলেন হোমিও বিজ্ঞানীরা। তারা ধূতরা বিষকে অল্পমাত্রায় বহুসংখ্যক সুস্থ ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন যাবৎ খাইয়ে কৃত্রিম রোগ লক্ষণ সৃষ্টি করতে লাগলেন। এ ধরনের সুস্থ ব্যক্তিদের বেশির ভাগ ছিলেন ইউরোপ এবং আমেরিকার এ্যালোপ্যাথি শাস্ত্রে এম,ডি, ডিগ্রীধারী চিকিৎসকবৃন্দ যারা এ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি নিয়ে গবেষণা করছিলেন । পরীক্ষায় দেখা গেল যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উন্মাদনার সঙ্গে কতগুলি বিশেষ লক্ষণ দেখা দিতে লাগল। লক্ষণগুলি হচ্ছে অশ¬ীল অঙ্গভঙ্গী বিশেষতঃ বিবস্ত্র হবার প্রবণতা, গালি দেওয়ার প্রবণতা, আলোতে এবং লোকসান্নিধ্যে থাকার ইচ্ছা এবং বক বক করার প্রবণতা। হোমিও বিজ্ঞানীরা এগুলোকে সূচক লক্ষণ (Key Word) বলে আখ্যায়িত করলেন। উন্মাদনার সঙ্গে এহেন লক্ষণের ২/৩ টি সূচক লক্ষণ যে রোগীর মধ্যে বিদ্যমান থাকবে তাদের বেলায় ধূতরা বিষ ১০০% ক্ষেত্রে সুফল প্রদান করতে পারবে বলে তারা মতামত ব্যক্ত করলেন। কার্যতঃ অসুস্থ রোগীকে মুখে খাইয়ে পরীক্ষার দ্বারা এই নীতির সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে বলে হোমিও বিজ্ঞানী তথা চিকিৎসকরা দীর্ঘদিন যাবৎ দাবী করে আসছেন।

যে সকল উন্মাদ রোগীর বিষন্নতা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়, তাদের বেলায় স্বর্ণধাতু দিয়ে তৈরী ওষুধ আরোগ্য সম্পাদন করতে প্রায় ১০০% ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে বলে পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। কারণ সুস্থ ব্যক্তিকে স্বর্ণধাতু দিয়ে তৈরী ওষুধ খাইয়ে পরীক্ষার সময় অনুরূপ সূচক লক্ষণ সৃষ্টি হতে দেখা গিয়েছিল। সুস্থ ব্যক্তিকে ধূতরা বিষ খাইয়ে পরীক্ষার সময় অনুরূপ সূচক লক্ষণ প্রকাশিত হতে দেখা যায়নি বলে স্বর্ণধাতু দিয়ে তৈরী ওষুধের স্থলে ধূতরার বিষ আরোগ্য সম্পাদন করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে হোমিও বিজ্ঞানীরা মনে করেন। সুস্থ ব্যক্তিদেরকে মুখে খাইয়ে এমন ধরনের শত শত ভেষজ উদ্দীপকের সূচক লক্ষণ নির্ধারণ করে হোমিওপ্যাথিক মেটিরিয়া মেডিকা নামক পুস্তকে লিপিবদ্ধ করা রয়েছে যার সাহায্যে বাছাই করে হোমিও চিকিৎসকগণ রোগীর উপর ওষুধ প্রয়োগ করে থাকেন। হোমিও পদ্ধতিতে ব্যবহৃত এহেন রোগলক্ষণের সাহায্যে পরিচালিত চিকিৎসা পদ্ধতিকে ডাঃ গার্থ বোরিক এম,ডি প্রমুখ আমেরিকান হোমিওপ্যাথগণ সিম্পটম এ্যানালজি বা লক্ষণ সাদৃশ্য দ্বারা চিকিৎসা পদ্ধতি বলে আখ্যায়িত করে গিয়েছেন।

অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে আরোগ্যের প্রধান বাধা হচ্ছে রোগ উৎপাদনকারী রোগবিষসমূহকে সনাক্ত করতে না পারা। যে কারণে দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সঠিকভাবে রোগবিষ বিনষ্টকারী এ্যান্টিবডি তৈরী করার কাজটি সম্পন্ন করতে পারছে না। অতীতে যখন বিজ্ঞানীরা এধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন তখন তারা একটি বিকল্প পন্থা অবলম্বন করেছেন। যেমন, বিদ্যুৎ শক্তি, চুম্বক শক্তি, ইত্যাদি অদৃশ্য শক্তিকে একটি বিকল্প পন্থার সাহায্যে পরিমাপ করার উপায় বিজ্ঞানীরা বের করেছেন। তেমনি হোমিওপ্যাথি শাস্ত্রে অজ্ঞাত পরিচয় রোগবিষকে চিহ্নিত করার জন্য লক্ষণ সাদৃশ্য বা সিম্পটম এ্যানালজি পদ্ধতিকে ব্যবহার করা হয়েছে। সুস্থ দেহে ভেষজ দ্বারা সৃষ্ট রোগ লক্ষণকে রোগীর দেহে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক রোগ লক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিচার করে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ভেষজকে বাছাই করে প্রয়োগ করার যে পদ্ধতি হোমিওপ্যাথিক বিজ্ঞানে প্রচলিত রয়েছে তার দ্বারা মানবদেহে রোগবিষ ধবংসকারী সঠিক এ্যান্টিবডি তৈরী করানো হয়ে থাকে। হোমিওপ্যাথিক আরোগ্যের প্রক্রিয়ার এই ব্যাখ্যা হয়ত চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নিকট অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে, যা ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথের বাধাকে অতিক্রম করতে সাহায্য করবে।
ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত এরূপ আরোগ্য নীতিকে ‘বিষদ্বারা বিষনাশ’ (বিষস্য বিষমৌষধম) বলে প্রাচীন ভেষজ বিজ্ঞানীদের দ্বারা আখ্যায়িত হয়ে এসেছে। আধুনিক ইমিউনোলজির আলোকে এই বহুল ব্যবহৃত প্রাচীন আরোগ্য পদ্ধতিকে ‘উদ্দীপক বা এ্যাডজুভ্যান্ট দ্বারা রোগপ্রতিরোধ বাহিনীকে উত্তেজিতকরণের সাহায্যে রোগবিষ বা এ্যান্টিজেন নাশ করার পদ্ধতি’ বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে । আধুনিক ইমিউনোলজির জ্ঞানের আলোকে উপরোক্ত হোমিও পদ্ধতির সাহায্যে ভেষজ বাছাই করণ এবং আরোগ্য পদ্ধতিকে সিলেকশন অব এ্যাডজুভ্যান্টস্ বাই সিম্পটম এ্যানালজি টু কিউর নন-ইনফেকশাস ডিজিজেস বাই ওরাল ইমিউনোমডুলেশন বা ‘লক্ষণ সাদৃশ্যের দ্বারা উদ্দীপক বাছাই করে মৌখিক উদ্দীপিতকরণ পদ্ধতির সাহায্যে অসংক্রামক রোগ নিরাময় পদ্ধতি’ বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। উপরোক্ত ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতিসমূহের মধ্যে ব্যবহৃত ব্যতিক্রমধর্মী প্রক্রিয়াসমূহ হচ্ছে- (ধ) প্রাকৃতিক রোগ লক্ষণ দ্বারা রোগীর দেহে বিদ্যমান রোগ সৃষ্টিকারী অজ্ঞাত পরিচয় রোগবিষকে চিহ্নিত করা, (ন) সুস্থ ব্যক্তির দেহে ভেষজ সেবন করিয়ে সৃষ্ট কৃত্রিম রোগ লক্ষণ দ্বারা ভেষজসমূহকে চিহ্নিত করা, (প) প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম রোগ লক্ষণসমূহকে তুলনা করে সদৃশতম রোগ লক্ষণের দ্বারা একটি ভেষজকে বাছাই করা এবং (ফ) ভেষজটিকে লঘু এবং সুস্বাদু করে ইনজেকশনের পরিবর্তে মুখে খাইয়ে রোগীর দেহে প্রয়োগ করা।
ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রাচীন ভেষজ বিজ্ঞানের সাদৃশ্য বিচার করার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অসংক্রামক রোগের অজ্ঞাত পরিচয় রোগবিষেরা, যাদের প্রকৃত রূপকে উন্মোচন করতে ব্যর্থ হচ্ছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সব শক্তিধর যন্ত্রগুলো। যার ফলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের পরিশ্রমলব্ধ ইমিউন সিস্টেম সম্বন্ধে এমন একটি জ্ঞানকে ‘অসংক্রামক’ রোগসমূহের চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। এই প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য উপরোক্ত ভেষজ বিজ্ঞানের এম্পিরিক্যাল বা পরীক্ষালব্ধ জ্ঞানের কার্যকারিতাকে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে পরীক্ষার দ্বারা যাচাই করে দেখা যেতে পারে। আধুনিক বিজ্ঞানীদের দ্বারা যদি প্রাচীন ভেষজ চিকিৎসার এরূপ নবমূল্যায়ন গ্রহনযোগ্য বলে বিবেচিত হয়, তাহলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বর্তমান দুটি বাধা অপসারিত হতে পারে, যথা-

(১) ইমিউনোথেরাপিতে ব্যবহৃত সাইটোকাইনের মত ইনজেকশনের দ্বারা প্রয়োগযোগ্য উদ্দীপকের স্বল্পতাজনিত প্রতিবন্ধকতা দুর করা ঃ ইমিউনোথেরাপিতে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত উদ্দীপকসমূহকে ইনজেকশনের দ্বারা প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। ইনজেকশনের দ্বারা যে কোন ভেষজ উপাদানকে প্রয়োগ করাতে মানবদেহে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ইন্টারফেরন, ইন্টারলিউকিন ইত্যাদি মাত্র গুটিকয়েক উদ্দীপক আবিষ্কার করতে পেরেছেন, যা ইনজেকশনের দ্বারা প্রয়োগ করা সম্ভব। ইনজেকশনের পরিবর্তে উদ্দীপকের মৌখিক প্রয়োগ যদি বিজ্ঞান সম্মত বলে স্বীকৃতি লাভ করে, তাহলে ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত অসংখ্য ভেষজ উপাদান মৌখিক উদ্দীপকের স্থান দখল করবে এবং উদ্দীপকের স্বল্পতা দূরীভূত হবে।
(২) অজ্ঞাত পরিচয় প্রাকৃতিক রোগবিষ সমূহকে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সনাক্ত না করতে পারার কারণে এ্যান্টিজেন স্পেসিফিক ইমিউনোষ্টিমুলেশন বা সুনির্দিষ্ট উদ্দীপিতকরণ পদ্ধতির ব্যবহার করতে না পারা ঃ মানবদেহের অসংখ্য অসংক্রামক রোগসমূহের উৎপাদক এ্যান্টিজেন বা রোগবিষ সমূহকে সনাক্ত না করতে পারার জন্য স্পেসিফিক এ্যাডজুভ্যান্ট বা সুনির্দিষ্ট উদ্দীপক সমূহকে নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিজ্ঞানীরা বিসিজি টিকার বিষ, ইন্টারফেরন, ইন্টারলিউকেন ইত্যাদি নন-স্পেসিফিক এ্যাডজুভ্যান্ট বা অনির্দিষ্ট উদ্দীপক ব্যবহার করার চেষ্টা করে সুনির্দিষ্ট ফল লাভ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কারণ দেহের রোগপ্রতিরোধ বাহিনীকে উদ্দীপিত করলেই মূল লক্ষ্য অর্জিত হবে না, তাদেরকে অজ্ঞাত পরিচয় রোগবিষকে সনাক্ত করার মত ক্ষমতা অর্জনের জন্য অজ্ঞাত পরিচয় রোগবিষের সমচরিত্র বিশিষ্ট উদ্দীপক দ্বারা উদ্দীপিত করে তুলতে হবে।
‘রোগপ্রতিরোধ শক্তিকে উদ্দীপিতকরণ’ হচ্ছে অনেকটা পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দানের মত কাজ। সমাজের অগণিত নির্দোষ মানুষের মধ্য থেকে অল্প সংখ্যক দোষী মানুষকে সনাক্ত করার জন্য পুলিশ বাহিনীকে দোষী মানুষের নমুনার সাহায্যে প্রশিক্ষণ দিতে হয়। উদ্দীপক হচ্ছে এমনই একটি নমুনা যাকে রোগপ্রতিরোধ বাহিনীর সামনে উপস্থাপিত করলে তবেই রোগপ্রতিরোধ বাহিনীর সদস্যরা উদ্দীপককে শত্রু হিসাবে সনাক্ত করে এবং উদ্দীপিত হয়ে উদ্দীপক এবং উদ্দীপকের সমচরিত্র বিশিষ্ট অজ্ঞাত রোগবিষসমূহকে ধ্বংস করার কাজটি সম্পাদন করতে সক্ষম হয়।
ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতিকে ওরাল ইমিউনোথেরাপির স্থলাভিষিক্ত করার পথে প্রধান বাধা হতে পারে একটি প্রশ্ন–আরোগ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত মুখে খাওয়ানো ভেষজ ও ইনজেকশনের দ্বারা দেহে প্রবিষ্ট উদ্দীপক একই মানের কিনা? অর্থাৎ মূখে খাইয়ে ভেষজ প্রয়োগ করলে পরিপাক ক্রিয়ার দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে তা যখন দেহে গৃহীত হয়, তখন সেই পরিবর্তিত ভেষজের দ্বারা সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া, রক্ত প্রবাহে সরাসরি মিশ্রিত উদ্দীপকের দ্বারা সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া একই মানের কিনা? এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে, পোলিও রোগের জীবাণু যে কোন পথে রক্তে প্রবেশ করলে পোলিও রোগ সৃষ্টি করে থাকে, সেই জীবাণুকে জীবন্ত অবস্থায় মুখে খাইয়ে পোলিও রোগপ্রতিরোধ করা হয় । অন্যদিকে মুখে খাওয়ালে ধুতুরা বিষ সুস্থ ব্যক্তির দেহে উন্মাদ রোগ সৃষ্টি করে এবং উন্মাদ রোগীকে একইভাবে মুখে খাওয়ালে উন্মাদ রোগ আরোগ্য করে।
অর্থাৎ সুস্থ দেহে রোগ উৎপাদন এবং অসুস্থ দেহে রোগের আরোগ্য সাধন-এ দুটো ধর্ম যার মধ্যে রয়েছে, সেই হবে এ্যাডজুভ্যান্ট বা উদ্দীপক। হোক না প্রয়োগের পদ্ধতি ভিন্নতর। যেহেতু ধূতরা বিষের ন্যায় অসংখ্য পরীক্ষিত ভেষজ সুস্থ মানবদেহে রোগ উৎপাদন করতে পারে এবং অসুস্থ দেহের রোগ আরোগ্য করতে পারে, সেহেতু মুখে খাওয়ানো ভেষজকেও উদ্দীপক হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে বলে ডাঃ গার্থ বোরিক এবং ডাঃ ও,এ, জুলিয়ান প্রমুখ হোমিও বিজ্ঞানীরা তাদের দৃঢ় মতামত ব্যক্ত করে গিয়েছেন । ঠিক যেমনিভাবে কার্যকর বলে প্রমাণিত হওয়ায় একদা প্রচলিত ইনজেকশনের পরিবর্তে পোলিও টিকার মুখে খাওয়ানোর পদ্ধতি বিজ্ঞানসম্মত বলে স্বীকৃতি পেতে বাধার সম্মুখীন হয়নি।
শুধুমাত্র আয়ুর্বেদ, ইউনানী এবং হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতিই নয়, আকুপাংচার পদ্ধতিতে ব্যবহৃত সুঁচ দ্বারা চিকিৎসার কার্যকারিতাকে ইমিউনোলজির জ্ঞানের আলোকে বিচার করে দেখতে হবে। দেহে প্রবিষ্ট সূঁচ হচ্ছে দেহের জন্য একটি বিজাতীয় পদার্থ। এই বহিরাগত সুঁচকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে রোগপ্রতিরোধ বাহিনীর মাঝে সৃষ্ট উত্তেজনা হয়তো দেহস্থ রোগবিষসমূহকে ধ্বংস করে রোগকষ্ট নিরাময় করে থাকে। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জন্তুর দেহে ফোঁটানো সূঁচের চারদিকে শ্বেতকণিকার মাঝে এরকম উত্তেজনা প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হয়েছেন। এভাবে ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের আলোকে আকুপাংচার পদ্ধতিতে সম্পন্ন আরোগ্য প্রক্রিয়াকে আমরা নন-স্পেসিফিক এ্যাডজুভ্যান্ট বা অনির্দিষ্ট উদ্দীপক এর সাহায্যে আরোগ্য সাধন প্রক্রিয়া বলে অখ্যায়িত করতে পারি ।
গ্রাম বাংলায় প্রচলিত ‘গুল দেওয়া’ পদ্ধতিও সম্ভবত এহেন একটি প্রক্রিয়া। গুল দেওয়া পদ্ধতিতে একটি মসৃণ কাষ্ঠ খন্ডকে পায়ের মাংসপেশীতে ছিদ্র করে প্রবিষ্ট করে রাখা হয়, যেখানে ক্রমাগত একটি বেদনাহীন প্রদাহ চলতে থাকে। এর ফলে বাত, গ্যাষ্ট্রিক আলসার ইত্যাদির উপশম হয় বলে জানা যায়। এই পদ্ধতির সঙ্গে উপরোক্ত আকুপাংচার পদ্ধতির একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমন একটি সমস্যা জর্জরিত অবস্থায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন না করে একটি বিকল্প প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা যদি ওরস্যালাইনের মত একটা সহজলভ্য পদ্ধতিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের সামনে উপস্থাপন করতে পারি, তাহলে সম্ভবত সাময়িকভাবে হলেও বর্তমান প্রতিবন্ধকতাকে অপসারণ করে এগিয়ে যাবার একটি পথের দিশা উন্মোচিত হতে পারে।
যে লবণ ও পানির মিশ্রণকে ইনজেকশন ব্যতীত মূখে খাওয়ালে দেহ সহজে গ্রহণ করতে চাইত না, সেই মিশ্রণে সামান্য চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু করে দিলে দেহ তা বিনা বাধায় গ্রহণ করে থাকে। এই সামান্য আবিস্কারটুকু ডায়ারিয়ার চিকিৎসায় বিপ¬ব ঘটিয়েছে। ঠিক তেমনি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মত জটিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পরিবর্তে লক্ষণ সাদৃশ্যের দ্বারা উদ্দীপক নির্বাচন এবং ইনজেকশনের পরিবর্তে মৌখিকভাবে উদ্দীপক প্রয়োগ করে রোগপ্রতিরোধ শক্তির নিয়ন্ত্রণ দ্বারা আরোগ্য সাধন পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দান করে এর ব্যাপক ব্যবহার চালু করলে হয়তো তেমনি একটা বিপ্লব ঘটতে পারে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s