রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী প্রধানতঃ অস্থিমজ্জার দূর্বলতা

এবার দেখা যাক, উপরোক্ত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মূলে দেহের কোন যন্ত্রটিকে সর্বাপেক্ষা বেশি দায়ী বলে চিহ্নিত করা যায়। একটু মনযোগ সহকারে লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে যে, একটি সুস্থ দেহে ইমিউন সিষ্টেম বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এমন সুন্দর ভাবে কাজ করে থাকে যে, বহিরাগত যে কোন জীবাণু এবং ভাইরাস এবং তাদের দ্বারা সৃষ্ট এন্টিজেন বা রোগবিষ দেহে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদেরকে ধ্বংস করা হয় । সেক্ষেত্রে দেহের ভিতরের পরিবেশ কোনক্রমেই একটি বিলম্বিত দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারেনা, যেমনটি হয়ে থাকে ইমিউন রিএ্যাকশন ডিজিজ এর ক্ষেত্রে কিংবা দেহের নিজস্ব উপাদানকে ধ্বংস করার মত ভ্রান্তি ঘটতে পারেনা (যেমনটি হয়ে থাকে অটোইমিউনিটির বেলায়) অথবা বহিরাগত শত্রুর যথেচ্ছ চারণভূমিতে পরিণত হওয়ার মত সুযোগ থাকতে পারেনা (যেমনটি হয়ে থাকে ইমিউনোডিফিশিয়েন্সির বেলায়)। এসবের জন্য দায়ী হচ্ছে রোগপ্রতিরোধ বাহিনীর দূর্বলতা আর সেই দূর্বলতার জন্ম হচ্ছে প্রধানত অস্থিমজ্জায়, যার উপরে নির্ভর করছে সবল বা দূর্বল শ্বেতকণিকার জন্ম দেবার বিষয়টি। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার পূর্বোক্ত তিন প্রকার বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি প্রধান কারণ যার নাম বোনম্যারো ডিফিশিয়েন্সি বা অস্থিমজ্জার দূর্বলতা, যেহেতু দেহের অস্থির মাঝে আবৃত অস্থিমজ্জাই হচ্ছে দেহের রক্তকণিকা তৈরীর প্রধান কারখানা। এযাবৎকাল চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বহু চেষ্টা করে অস্থিমজ্জার শক্তিবৃদ্ধি করার উপযোগী কয়েকটি উপাদান আবিষ্কার করতে সক্ষম হলেও সেগুলো এখনো পর্যন্ত কেবলমাত্র ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে কেমোথেরাপির পর এবং এছাড়া অল্প কয়েকটি রোগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিশৃঙ্খলাজনিত অসংখ্য রোগের বেলায় এগুলোর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এগুলোর নাম হচ্ছে কলোনী-ষ্টিমুলেটিং ফ্যাক্টর বা সি,এস,এফ, টিউমার নেক্রোসিস ফ্যাক্টর বা টি,এন,এফ, এরিথ্রোপোয়েটিন, থাইমোপোয়েটিন ইত্যাদি। এদের জন্ম আসলে দেহের মধ্যেই হয়ে থাকে, যেগুলোকে এখন দেহের বাইরে কৃত্রিমভাবে তৈরী করে প্রয়োজনে অসুস্থ দেহে সরবরাহ করা হয়।

মজ্জার ভিতর তৈরী হচ্ছে লোহিতকণিকা এবং শ্বেতকণিকা নামক দু’ধরনের রক্তকণিকা। সুস্থ এবং সক্ষম রক্তকণিকা ব্যতীত বহিরাগত জীবাণু এবং ভাইরাস নামক শত্রুর হাত থেকে দেহকে মুক্ত রাখার কোনই উপায় নেই। কেমোথেরাপির পর এসব রক্তকণিকার সংখ্যা কমে গেলে উপরোক্ত উপাদানগুলো প্রয়োজন মত বাছাই করে রোগীর দেহে প্রয়োগ করা হয়। যদিও এর চাইতে সহজলভ্য কোন উপাদানের সাহায্যে মজ্জার শক্তি বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছেনা, কিন্তু অস্থিমজ্জার শক্তিকে খর্ব করার মত ইমিউনোসাপ্রেসিভ বা অবদমনকারী অসংখ্য উপাদান রয়েছে যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে তেজস্ক্রিয় রশ্মি বা আয়োনাইজিং রেডিয়েশন এর প্রয়োগ। এই তেজস্ক্রিয় রশ্মি অস্থিমজ্জার শক্তিকে দুর্বল করে সৃষ্টি করে থাকে ক্যান্সার, শিশুর জন্মগত বিকৃতি, বন্ধ্যাত্ব, জীনগত বিকৃতি এবং ঘটিয়ে থাকে আয়ুস্কালের হ্রাস প্রাপ্তি ইত্যাদি। জীবাণু এবং ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট রোগকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও তেজষ্ক্রিয় শক্তির দ্বারা সৃষ্ট রোগসমূহকে কোন ওষুধের দ্বারা নিরাময় করা সম্ভব নয়।

এহেন ক্ষতিকর তেজষ্ক্রিয় রশ্মির মধ্যে “ গামা ” রশ্মিকে ব্যবহার করা হয় ক্যান্সার রোগ চিকিৎসার জন্য। ক্যান্সার রোগের বেলায় মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার দূর্বলতার সুযোগে সুস্থ কোষের জীনগত চরিত্র পরিবর্তিত হয়ে সৃষ্টি হয় বিকৃত কোষ যার নাম ক্যান্সার কোষ। এই ক্যান্সার কোষ মানুষের স্বাভাবিক কোষকে ধ্বংস করে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। ঐ সকল ক্যান্সার কোষগুলোকে ধ্বংস করার জন্য গামা রশ্মি নামক অদৃশ্য আলোক রশ্মির নীচে রোগীর দেহের ক্যান্সার আক্রান্ত অংশটিকে রাখা হয়। এর ফলে ক্যান্সার কোষগুলি মারা পড়ে। কিন্তু এই চিকিৎসার একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর দিক হচ্ছে এই যে, গামা রশ্মির দ্বারা ক্যান্সার কোষসমূহকে ধ্বংস করার সময় দেহের সুস্থ কোষও বহুল পরিমাণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। সেই সঙ্গে দেহের অস্থিমজ্জারও ক্ষতি হয়ে থাকে। ঐ গামা রশ্মির দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতি সাময়িক নয়, এর ফলে রোগীদের সুস্থ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে যা কোনদিনই সুস্থতা ফিরে পায়না। ফলে ক্যান্সার রোগ থেকে সাময়িকভাবে আরোগ্যপ্রাপ্ত রোগীরা আবার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং তখন গামা রশ্মি প্রয়োগ করে আর কোন উপকার পাওয়া যায়না। বিশ্বের লক্ষ লক্ষ ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর শেষ পরিণতি এভাবেই ঘটে থাকে।

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, অস্থিমজ্জার দুর্বলতার কারণে সৃষ্ট অক্ষম রোগপ্রতিরোধ বাহিনীর দ্বারা যখন বহিরাগত শত্রুর ধ্বংস সাধিত হয় না বরং দেহের নিজস্ব উপাদানের ক্ষতি সাধিত হয়ে জটিল রোগের সৃষ্টি হয় তখন বিজ্ঞানীরা প্রেডনিসোলন বা ওরাডেক্সন এর মত ষ্টেরয়েড জাতীয় উপাদানের সাহায্যে রোগপ্রতিরোধ বাহিনীকে অকর্মণ্য করে রাখতে বাধ্য হন । আবার যখন রোগপ্রতিরোধ মতা অকর্মণ্য হয়ে ক্যান্সার রোগের সৃষ্টি করে, তখন সেই ক্যান্সার কোষসমূহকে ধ্বংস করার সময় দেহের মজ্জার অবশিষ্ট ক্ষমতাটুকুও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় তেজস্ক্রিয় রশ্মির কারণে। এহেন প্রক্রিয়ার নাম বোনম্যারো সাপ্রেশন বা মজ্জার অবদমন, যা কোন মতেই অভিপ্রেত নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল বোনম্যারো ষ্টিমুলেশন যার দ্বারা ইমিউনোমডুলেশন বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করে সঠিকভাবে রোগপ্রতিরোধ করা যায়। যে উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানী জুলস টি, ফ্রয়েন্ড এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে নানাবিধ এ্যাডজুভ্যান্ট নিয়ে গবেষণা করে শেষ পর্যন্ত ইন্টারফেরণ এবং ইন্টারলিউকেন এর মত উপাদান আবিষ্কৃত হয়েছে যার নাম এক কথায় সাইটোকাইন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s