রোগপ্রতিরোধ বিদ্যার জ্ঞানের অভাবজনিত ভুল পদক্ষেপ

ইমিউনোলজির জ্ঞানের যথাযথ প্রয়োগের পথের বাধা চিকিত্সা বিজ্ঞানীদিগকে কিভাবে ভুল পথে পরিচালিত করছে :

(ক) রোগকে দ্রুতগতিতে নির্মূল করার জন্য প্রাচীন চিকিত্সা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত ভেষজসমুহের লঘুমাত্রাকে অতিরিক্ত পরিমাণে শক্তিশালীকরণ :
ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের বিকাশের পূর্বে নন-ইনফেকশাস বা অসংক্রামক রোগসমুহের সঠিক কারণ নির্ধারন করতে না পারার কারণে সৃষ্ট বিভ্রান্তি চিকিত্সা বিজ্ঞানীদিগকে এযাবত প্রচলিত প্রাচীনপন্থিদের লঘুমাত্রায় প্রাকৃতিক ভেষজ ব্যবহার করার সঠিক পথ থেকে বিচচুত করেছিল। আদিকালে বিশ্বের সর্বত্র রোগের চিকিত্সা প্রায় একই পদ্ধতিতে চলছিল। দার্শনিক হিপোক্রেটিস ছিলেন চিকিত্সা বিজ্ঞানের আদি রূপকার। তাঁর মতে দেহকে সবল রাখাই ছিল রোগমুক্ত থাকার একমাত্র সঠিক উপায়। আয়ুর্বেদ, ইউনানী, এবং হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞানীগণ হিপোক্রেটিসের মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। চিকিত্সা বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ১৮৭৩ সালে জীবাণু মতবাদের সৃষ্টি করলেন। তিনি জীবাণুকেই সকল ব্যাধির মূল কারণ বলে অভিহিত করলেন এবং তা প্রমাণ করে দেখালেন। জীবনীশক্তিকে বাড়িয়ে রোগমুক্ত থাকার যে মতবাদে এতদিন চিকিত্সা বিজ্ঞান আস্থাশীল ছিল, সেই মতবাদ পরিত্যক্ত হয়ে গেল। সকল চিকিত্সা বিজ্ঞানের চাইতে বেশী অগ্রসরমান হয়ে গেল এ্যালোপ্যাথিক চিকিত্সা বিজ্ঞান।
অসংক্রামক রোগের বেলায় রোগের মূল কারণ বের করতে না পারার কারণে বিজ্ঞানীরা রোগকে দ্রুত এবং স্থায়ীভাবে নির্মূল করার জন্য ভেষজের এ্যালক্যালয়েড বা উপক্ষার সমূহকে পৃথক করে অধিকমাত্রায় প্রয়োগ করার পথ বেছে নিলেন। তাই এভাবে ভেষজের এ্যালক্যালয়েড বা উপক্ষার সমূহকে উদ্ভিদের নির্য্যাস থেকে পৃথক করে মানবদেহে কখনো মুখে খাইয়ে আবার কখনো ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করে রোগের চিকিত্সা পদ্ধতির উপর বেশী গুরুত্ব আরোপ করা শুরু করলেন। এভাবে প্রাকৃতিক চিকিত্সাকে অধিকতর কার্যকর করার নতুন একটি পথ তারা বেছে নিলেন। যেমন- সিঙ্কোনা গাছের ছাল থেকে প্রাপ্ত ২০টি এ্যালক্যালয়েড বা উপক্ষার থেকে পৃথক করা হল কুইনাইন নামক একটি উপক্ষারকে, যার ক্ষমতা প্রমাণিত হল ম্যালেরিয়ার জীবাণু ধ্বংস করার ক্ষেত্রে। ফলে সিঙ্কোনা গাছের নির্যাসের ব্যবহার জনপ্রিয়তা হারালো।কিন্তু বিশুদ্ধ কুইনাইন সেবনের ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিল। যে সিঙ্কোনা নির্য্যাস সেবনে মানুষ ম্যালেরিয়া মুক্ত হবার পাশাপাশি ক্ষুধাহীনতা এবং রক্তশুন্যতা থেকে মুক্তি পেত, সেই বলবর্দ্ধক বা টনিক জাতীয় গুণ থেকে মানুষ বঞ্চিত হল। বিশুদ্ধ কুইনাইন সেবনকারী রোগী দুর্বলতা, শিরঃপীড়া ইত্যাদি রোগের শিকার হতে লাগলো।
উইলো গাছের ছাল থেকে তৈরী স্যালিসাইলিক এ্যাসিড থেকে তৈরী হল এ্যাসপিরিন, যার প্রধান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে পাকস্থলি এবং অন্ত্রে ক্ষত তৈরী করে রক্তক্ষরণ সৃষ্টি করা। অথচ হোমিওপ্যাথিতে স্যালিসাইলিক এ্যাসিড অন্ত্রের ক্ষত আরোগ্যের কাজে এখনও প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।
এভাবে ডিজিটালিস থেকে ডিগোক্সিন, হাইড্রাসটিস থেকে হাইড্রাসটিন, ইপিকাক থেকে এমিটিন, ফাইসোষ্টিগমা থেকে ফাইসোষ্টিগমাইন, জাবোরান্ডি থেকে পাইলোকার্পিন, কিউরারে থেকে ডি-টিউবোকিউরারাইন, কোকো থেকে কোকেইন, তামাক থেকে নিকোটিন, চা এবং কফি থেকে ক্যাফেইন, বেলেডোনা থেকে এ্যাট্রোপিন ইত্যাদি বহুসংখ্যক উদ্ভিদ থেকে যখনই উপক্ষারসমূহকে পৃথক করে অধিকমাত্রায় ব্যবহার করা হল, তখন থেকেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেড়ে গেল এবং রোগ আরোগ্যের চাইতে ড্রাগ ডিজিজ বা ঔষধ দ্বারা সৃষ্ট রোগ দেখা গেল। এছাড়া পারদ, স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, ফসফরাস, দস্তা, আর্সেনিক ইত্যাদি ভারী ধাতু সমূহের বেশি মাত্রায় ব্যবহার জনিত বিষক্রিয়া এত বেশি বেড়ে গেল যে, এদের সূক্ষ্ম মাত্রায় ব্যবহারের অত্যাশ্চর্য উপকারীতার বিষয়টি থেকে মানবজাতি বঞ্চিত হয়ে রইল। তেমনি বিবিধ সর্পবিষের সূক্ষ্ম ব্যবহারের উপকারীতা কেবলমাত্র হোমিওপ্যাথি ব্যতীত অন্য সব চিকিত্সা বিজ্ঞানীদের নিকট অজানাই রয়ে গেল।
অথচ এসব উদ্ভিদজাত, খনিজ, প্রাণীজ এবং রোগজ উপাদানের স্বল্পমাত্রায় ব্যবহারের দ্বারা আরোগ্য প্রক্রিয়াকে একমাত্র ফ্রয়েন্ডের উদ্ভাবিত এ্যাডজুভেন্ট বা উদ্দীপক দ্বারা ইমিউনোষ্টিমুলেশন বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার শক্তিবৃদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করা চলে। একথাটি তখনো জানা না থাকার কারণে চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন যাবত ঘনীভূত ভেষজের দ্বারা অসংক্রামক রোগ চিকিত্সার পিছনে বহু প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে আরোগ্যের পথ পরিত্যাগ করে রোগকষ্ট কমিয়ে রাখার চেষ্টা শুরু করলেন এবং অত্যন্ত জটিল সব প্রক্রিয়া আবিষ্কার করে ফেললেন, যেগুলো দেহকে বিষমুক্ত না করে বরং বিষের আধিক্য বাড়িয়ে জটিল সমস্যার সৃষ্টি করতে লাগল।
(খ) দেহে চলমান নানাবিধ স্বাভাবিক জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে রোগকষ্টকে কমিয়ে রাখার অত্যাধুনিক পদ্ধতি যা বর্তমানে রোগ চিকিত্সায় ব্যবহৃত হচ্ছে : ইমিউনোলজি বা রোগপ্রতিরোধ বিজ্ঞানের বিকাশের পূর্বে চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন যাবত কাল্পনিক মতবাদের উপর ভিত্তি করে এগুচ্ছিলেন। অসুস্থ রোগীর দেহে বিভিন্ন ভেষজ প্রয়োগ করে পরীক্ষার দ্বারা ভেষজের আরোগ্য ক্ষমতা নির্ধারণ করা হতো যার নাম এমপিরিক্যাল বা পরীক্ষামূলক পদ্ধতি। এধরনের পরীক্ষামূলক পদ্ধতিগুলো অনেকাংশে দাঁড়িয়েছিল অবৈজ্ঞানিক ও কাল্পনিক মতবাদের উপর ভিত্তি করে, যেমন- আয়ূর্বেদ শাস্ত্রের ‘বিষে বিষনাশ’ বা ‘বায়ু, পিত্ত, কফ’ মতবাদ, ইউনানী শাস্ত্রের ‘উষ্ণ, শুষ্ক, আর্দ্র মেজাজের মতবাদ, হোমিওপ্যাথির ‘সমবিধান বা লাইক কিওরস লাইক’ মতবাদ ইত্যাদি। সর্ব প্রথম জেনার, লুইপাস্তুর ইত্যাদি চিকিত্সা বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা ইমিউনোলজি বা রোগপ্রতিরোধ বিদ্যা সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করতে শুরু করেন। এর ফলে জার্ম থিয়োরী বা জীবাণু মতবাদ জোরদার হয়ে ওঠে এবং জীবাণু ধবংস করে রোগমুক্তির চেষ্টা চলতে থাকে। এভাবে প্রতিটি রোগের জন্য দায়ী জীবাণুকে সনাক্ত করার চেষ্টা শুরু হয়। এরপর আসে টিকাদান পদ্ধতি এবং জীবাণুনাশক এ্যান্টিবায়োটিক, জ্বর-সর্দি-কাশি, পাতলা পায়খানা, আমাশয়, বমি, বেদনা ইত্যাদি রোগকষ্ট উপশমকারী সব ওষুধ, আসে এ্যালার্জিনাশক এ্যান্টিহিষ্টামাইন এবং সবচাইতে বেশী শক্তিশালী বহুল পরিচিত এবং চিকিত্সা জগতে সমাদৃত ষ্টেরয়েড বা হরমোন জাতীয় ওষুধ ওরাডেক্সন/কর্টিসন/ প্রেডনিসোলন এর মত ওষুধ, যেগুলো রোগকষ্টকে অতিদ্রুত কমিয়ে রোগীকে এনে দেয় অনাবিল শান্তি ।
চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের কল্যাণে দেহকোষের গভীরে দৃষ্টি প্রসারিত করতে সক্ষম হলেন এবং উদ্ভাবন করলেন (১) রিসেপ্টর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, (২) এনজাইম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, (৩) আয়োন চ্যানেল নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং (৪) ক্যারিয়ার মলিকিউল বা বহনকারী অণু নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। রিসেপ্টর হচ্ছে দেহকোষের বাহিরের আবরণের এক বা একাধিক দরজা, যার ভিতর দিয়ে বিভিন্ন সূক্ষ্ম জৈব রাসায়নিক (বায়োকেমিক্যাল) পদার্থ কোষের ভিতর প্রবেশ করে কিংবা বের হয়। ঐসকল রিসেপ্টরগুলোকে প্রয়োজনমত খোলা বা বন্ধ করার পদ্ধতি চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করে ফেললেন। এই উদ্দেশ্যে যে সকল ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে তাদের নাম এ্যাগোনিষ্ট, এ্যান্টাগোনিষ্ট, চ্যানেল ব্লকার, ইনহিবিটর, ইত্যাদি। উদাহরণস্বরূপ, এইচ-১ অথবা এইচ-২ অথবা এইচ-৩ রিসেপ্টর এ্যান্টাগোনিষ্ট, ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার, এইস-ইনহিবিটর, ইত্যাদি। এর সাহায্যে চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা এ্যালার্জি, গ্যাষ্ট্রিক আলসার, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি ইমিউনোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বিশৃঙ্খলা দ্বারা সৃষ্ট দেহের প্রায় সকল প্রকার রোগকষ্টকে কমিয়ে রোগীদেরকে বাঁচিয়ে রাখেন।
কিন্তু এর দ্বারা দেহ বিষমুক্ত হয়না। ফলে ওষুধের ক্রিয়া শেষ হবার সংগে সংগেই রোগকষ্ট পূনরায় ফিরে আসে। এর পরিণতিতে দীর্ঘদিন ওষুধ সেবনের পর দেহের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রগুলো অকেজো হয়ে পড়ে, যখন আর কোন ওষুধই কষ্ট লাঘব করতে পারেনা। বরং ক্রমাগত নতুন ধরনের যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিতে থাকে। এর ফলে মানুষ রোগপ্রবণতার কারণে ক্রমাগত রোগের শিকার হয়ে ওষুধের উপর নির্ভরশীল হয়ে এক ধরনের জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে থাকে। উপরোক্ত উপায়ে রোগ চিকিত্সার পাশাপাশি ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের গবেষণা চলতে থাকে। ফলে অসংক্রামক রোগসমুহের প্রকৃত কারণগুলি আবিষ্কৃত হয়, যেগুলি দ্বারা বিজ্ঞানীরা অসংক্রামক রোগের প্রকৃত কারণ জানতে সক্ষম হলেন।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s