হোমিওপ্যাথিক নীতিমালার প্রয়োগের কিছু পরিবর্তন

(ক) লক্ষণসাদৃশ্য ব্যতীত ওষুধের প্রয়োগ
(খ) একাধিক ওষুধের পর্যায়ক্রমিক প্রয়োগ
(গ) হোমিওপ্যাথিক শক্তি পরিবর্তন নীতির সঠিক প্রয়োগ
(ঘ) আল্ট্রাভায়োলেট বা অতিবেগুনী রশ্মির পরোক্ষ ব্যবহার

(ক) লক্ষণসাদৃশ্য ব্যতীত ওষুধের প্রয়োগ : পূর্বে বর্ণিত লঘুকরণ বা এ্যাটেনুয়েশন, সুস্বাদুকরণ এবং ইনজেকশনের পরিবর্তে মুখে খাওয়ানো এই তিনটি প্রক্রিয়ার ব্যবহার হোমিওপ্যাথিতে রয়েছে যা বর্তমানে এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা বিজ্ঞান দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও আমরা সূক্ষ্ম মাত্রায় হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ব্যবহার করেই চিকিৎসা কার্য সম্পাদন করছি কিন্তু হোমিওপ্যাথির প্রধান দুটি নীতিমালাকে মেনে চলতে গেলে আমাদের উদ্দেশ্য সাধিত হয়না। তাই আমরা এর কিছু পরিবর্তন করেছি। ইমিউনোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিশৃঙ্খলাজনিত জটিল রোগ যেমন- উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবিটিস, ক্যান্সার ইত্যাদির বেলায় দেহের রসগত, কোষগত এবং মজ্জাগত এই তিনটি ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল গভীরক্রিয় ওষুধ, যেমন- রোগজীবাণু দ্বারা তৈরী টক্সয়েড জাতীয় ওষুধ এবং রেডিয়াম, ইউরেনিয়াম ইত্যাদি তেজষ্ক্রিয় পদার্থের সূক্ষ্মমাত্রায় প্রয়োগের বেলায় টোটালিটি অব সিম্পটম্স বা লক্ষণ সাদৃশ্য এবং কী সিম্পটম্স বা সূচক লক্ষণ বিচার করে ওষুধ প্রয়োগ করা কার্যতঃ অসম্ভব। রোগজনিত দেহের প্যাথলজিক্যাল চেইঞ্জেস বা যান্ত্রিক পরিবর্তনসমূহকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবলমাত্র বাহ্যিক লক্ষণগুলোকে দূর করলে আধুনিক এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসায় প্রচলিত প্যালিয়েশন বা উপশমকারী চিকিৎসার মত ফল পাওয়া যাবে, যার দ্বারা প্রকৃত আরোগ্যের উদ্দেশ্য সফল হবে না। এ যাবত প্রচলিত ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথির বেলায় যুগ যুগ ধরে একারণেই সম্ভবতঃ আরোগ্যের পরিবর্তে কেবলমাত্র উপশম দেয়ার কাজটিই করা হচ্ছিল।
উদাহরণস্বরূপ, হোমিও চিকিৎসকমাত্রই লক্ষ্য করে থাকবেন যে, প্রায়শঃই অনেক যতœসহকারে বাছাই করা হোমিও ওষুধ দ্বারা অনেক এ্যাকিউট বা তীব্র রোগলক্ষণকে দূরীভূত করা যায় না। সে ক্ষেত্রে ‘অর্গানন’ নামক হোমিও নীতিমালার পরামর্শ হচ্ছে সোরা, সাইকোসিস, সিফিলিস এবং টিউবারকুলার এই চার প্রকার জন্মগতভাবে প্রাপ্ত মায়াজম নামক রোগবিষের উপর ভিত্তি করে গভীরক্রিয় একটি ওষুধবাছাই করে প্রয়োগ করা । এক্ষেত্রে কিন্তু হোমিও লক্ষণ সাদৃশ্য বিচারের উপর আরোপিত গুরুত্বকে শিথিল করা হয়েছে। ইমিউনোলজির জ্ঞান দ্বারা সমগ্র বিষয়টিকে পর্যালোচনা করলে আমরা হোমিও নীতিমালার একটি যৌক্তিকতা দেখতে পাই। পূর্বে বর্ণিত এইচ, এল, এ’র প্রভাবে সৃষ্ট জন্মগতভাবে প্রাপ্ত রোগ প্রবণতার সঙ্গে মায়াজমের একটি সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। হোমিওপ্যাথিতে লক্ষণ সাদৃশ্যের দ্বারা বাছাই করা ওষুধের সাহায্যে হিউমরাল বা রসগত এবং সেলুলার বা কোষগত ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলাকে দূরীভূত করা যায় কিন্তু এইচ,এল,এ’র প্রভাবে সৃষ্ট জেনেটিক বা জীনগত ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা জনিত সৃষ্ট রোগের ক্ষেত্রে লক্ষণ সাদৃশ্যবিহীন বোনম্যারো ষ্টিমুলেশন বা মজ্জার শক্তি বৃদ্ধি করতে সক্ষম গভীরক্রিয় জীবাণুজ এবং তেজষ্ক্রিয় ওষুধের প্রয়োজন।
(খ) একাধিক ওষুধের পর্যায়ক্রমিক প্রয়োগ : হোমিওপ্যাথি শাস্ত্র ওষুধের কেবলমাত্র একক মাত্রায় প্রয়োগকে সমর্থন করে। একটি ওষুধের আরোগ্যের ক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ওষুধ প্রয়োগ করাকে সমর্থন করে হোমিওপ্যাথি। আলোচ্য নব উদ্ভাবিত ওষুধ প্রয়োগ প্রক্রিয়ায়, ওষুধের পর্যায়ক্রমিক প্রয়োগকে সমর্থন করা হয়েছে। যেক্ষেত্রে রোগের কারণ রসগত, কোষগত এবং মজ্জাগত দূর্বলতা, সেক্ষেত্রে একাধিক ওষুধ বাছাই করে দীর্ঘদিন যাবত সূক্ষ্মমাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে যাতে করে জেনেটিক্যালি ইনহেরিটেড বা জন্মগতভাবে প্রাপ্ত এবং অর্জিত সর্বস্তরের বিশৃঙ্খলাকে আরোগ্য করা সম্ভব হয় । দেহের মজ্জাকে উদ্দীপিত করলে কোষগত এবং রসগত ক্ষেত্রে রোগপ্রতিরোধ বাহিনী কর্তৃক ব্যাপক রোগ বিধ্বংসী কর্মকান্ড শুরু হয়ে যায়। যার ফলে নানাবিধ নতুন রোগলক্ষণ দেখা দিতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, একজন ডায়াবিটিস রোগীকে ইউরেনিয়াম নাইট্রেট সেবন করালে তার জ্বর অথবা পাতলা পায়খানা শুরু হতে পারে অথবা কিডনির সমস্যার বৃদ্ধি হতে পারে। সোরায়সিস এর রোগীকে ওষুধ দিলে তার রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস জনিত গেঁটে বাতের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রথম ওষুধটির ক্রিয়াকে সম্পন্ন করার জন্য পর্যায়ক্রমিক ভাবে লক্ষণ অনুযায়ী একটির পর একটি ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়। পরবর্তী রোগলক্ষণের জন্য বাছাই করা ওষুধের পাশাপাশি প্রথম ওষুধটি চালিয়ে যেতে হয় অন্যথায় মজ্জার উপর আরোপিত আরোগ্যকারী ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে।
(গ) হোমিওপ্যাথিক শক্তি পরিবর্তন নীতির সঠিক প্রয়োগ : হোমিওপ্যাথির প্রবর্তক বিজ্ঞানী হ্যানিম্যান কর্তৃক প্রদত্ত নীতিমালা অনুযায়ী ওষুধের শক্তি পরিবর্তনের শর্ত হচ্ছে (১) এ্যাটেনুয়েশন বা লঘুকরন এবং (২) সাক্কাসশান বা ঝাঁকি প্রদান। তার মৃতুর পর তার প্রবর্তিত পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতির ব্যাখ্যায় কিছু ভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের হোমিওপ্যাথগণ শুধুমাত্র ঝাঁকির দ্বারা শক্তি পরিবর্তন করে একই ওষুধ বার বার সেবন করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যার ফলে পুনঃপুনঃ একই শক্তির ওষুধ সেবনের ফলে রোগীর দেহে ওষুধের প্র“ভিং হয়ে থাকে যা আরোগ্যের পরিবর্তে ওষুধজনিত রোগ (ড্রাগ ডিজিজ) সৃষ্টি করতে পারে। তাই আমাদের পদ্ধতিতে ওষুধের শক্তি পরিবর্তনের কাজটি রোগীদের উপর ন্যস্ত না করে প্রত্যহ সেবনের জন্য পরিবর্তিত একাধিক শক্তির ওষুধ সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
(ঘ) আল্ট্রাভায়োলেট বা অতিবেগুনী রশ্মির পরোক্ষ ব্যবহার : হোমিওপ্যাথিতে রঞ্জন রশ্মি দ্বারা শক্তিকৃত এ্যালকোহল দিয়ে তৈরী ওষুধের নাম ‘এক্স-রে’ যা রক্তের ক্যান্সার চিকিৎসায় খুবই কার্যকর এবং হোমিও জগতে একটি সমাদৃত ওষুধ। সৌর রশ্মির দ্বারা ল্যাকটোজকে শক্তিকৃত করে আবিষ্কৃত হয়েছিল ‘সল’ নামক একটি ওষুধ, জনপ্রিয়তার অভাবে ওষুধটি বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে গিয়েছে। ঐ ওষুধটির বিকল্প একটি ওষুধ তৈরী করা হয়েছে এ্যালকোহলকে সৌর রশ্মির প্রধান উপাদান আল্ট্রাভায়োলেট বা অতিবেগুনী রশ্মির দ্বারা শক্তিকৃত করে, যা প্রথমোক্ত এক্স-রে নামক ওষুধটির চাইতে অনেক বেশী ক্রিয়াশীল বলে পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। সংশোধিত ফর্মূলার সাহায্যে তৈরী এই ওষুধটি হোমিও ফার্মাকোপিয়াতে বিদ্যমান তেজষ্ক্রিয় ওষুধের মত একটি শক্তিশালী ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s