ওষুধের আরোগ্যকারী ক্ষমতার বিকাশ ঘটানো এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত করার উপায় সমুহ

টক্সিক বা বিষাক্ত ওষুধকে দেহের জন্য গ্রহণযোগ্য করে ওষুধের আরোগ্যকারী ক্ষমতার বিকাশ ঘটানো এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত করার উপায় সমূহ :
(ক) এ্যাটেনুয়েশন বা লঘুকরণ
(খ) বিষাক্ত ওষুধের সুস্বাদুকরণ
(গ) ইনজেকশনের পরিবর্তে মুখে খাইয়ে ওষুধ প্রয়োগ পদ্ধতি

(ক) এ্যাটেনুয়েশন বা লঘুকরণ : আদিকাল থেকে প্রতিটি চিকিত্সা পদ্ধতিতে যত ওষুধ ব্যবহৃত হয়ে আসছে সেগুলোর প্রায় সবকটি ওষুধই মানবদেহের জন্য টক্সিক বা বিষাক্ত ছিল। পুষ্টিকর কিংবা সুস্বাদু উপাদানসমুহ খাদ্য হিসাবে জনপ্রিয় হলেও রোগ চিকিত্সার জন্য বিষাক্ত এবং তিক্ত উপাদানই ওষুধ হিসাবে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছিল। ঐ সকল বিষাক্ত উপাদানগুলোর ক্ষতিকারক বিষক্রিয়াকে এড়িয়ে কেবলমাত্র আরোগ্যকারী গুণাবলীকে ব্যবহার করার প্রথম উপায় হিসাবে লঘুকরণ বা তীব্রতা কমিয়ে নেওয়াকেই নিরাপদ ওষুধ প্রয়োগ পদ্ধতি হিসাবে স্বীকৃতিলাভ করে। বিশেষ করে হোমিওপ্যাথিতে এই পদ্ধতি প্রথম প্রচলিত হয় যা ডাইলিউশন নামে পরিচিত। আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানে টিকাদান প্রক্রিয়ায় এই পদ্ধতিটি বিশেষভাবে পরীক্ষিত এবং গৃহীত হয়েছে।
(খ) বিষাক্ত ওষুধের সুস্বাদুকরণ : এরপর আর একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, ওষুধের যে কোন উপাদান বেশীমাত্রায় ইনজেকশনের দ্বারা প্রয়োগ করলে যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়, অল্পমাত্রায় এবং মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে সুস্বাদু করে মুখে খাইয়ে প্রয়োগ করলে অপেক্ষাকৃত কম কিংবা বিনা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সেই উদ্দেশ্য সাধন করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, ওরস্যালাইন এর বিষয়টি উল্লেখ্য। যে লবণ পানির মিশ্রণকে ইনজেকশন ব্যতীত মুখে পান করালে দেহ সহজে গ্রহণ করতে চাইত না এবং ইনজেকশনের দ্বারা প্রয়োগ করলে এ্যালার্জিজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিত, সেই মিশ্রণে অল্প পরিমাণে চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু করে দিলে দেহ তা বিনা বাধায় গ্রহণ করে থাকে।
এই সামান্য আবিষ্কারটুকু ডায়ারিয়ার চিকিত্সায় বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই আবিষ্কারের শতশত বছর আগে থেকে আয়ুর্বেদশাস্ত্রীগণ বিবিধ বিষাক্ত বা টকসিক ওষুধকে মধু এবং চাউল ধোয়া পানির সাথে মিশিয়ে খলে মাড়িয়ে সেবন করিয়ে এসেছেন। তারপর ইউনানী চিকিত্সাপন্থীরা প্রতিটি ওষুধকে শর্করা সহযোগে সুমিষ্ট করে রোগীদেরকে সেবন করান। তেমনি হোমিওপ্যাথিতেও শর্করা কিংবা দুগ্ধশর্করা (ল্যাকটোজ) এবং এ্যালকোহলের সঙ্গে মিশিয়ে ওষুধ প্রয়োগবিধি প্রচলিত রয়েছে, যার সঠিক উপকারীতার কারণ তত্কালীন প্রাচীনপন্থী গবেষকবৃন্দ উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেও হাতে কলমে পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করতে সক্ষম হননি, যার সঠিক ব্যাখ্যা আমরা আজ পাচ্ছি ওরস্যালাইনের গবেষণার মাধ্যমে।
(গ) ইনজেকশনের পরিবর্তে মুখে খাইয়ে ওষুধ প্রয়োগ পদ্ধতি : ইনজেকশনের পরিবর্তে মুখে সেবন করানোর ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে এড়ানো সম্ভব হয়েছে পোলিও টিকার বেলায়। ইনজেকশনের দ্বারা প্রয়োগ করার ফলে পোলিওতে আক্রান্ত হবার মত দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গেছে অনেক শিশু। টিকা আবিষ্কারের প্রথম অবস্থায় বসন্ত এবং যক্ষ্মারোগের টিকা প্রয়োগের সময় অধিক পরিমানে টিকায় ব্যবহৃত উপাদানকে দেহে প্রয়োগ করা হত, যার ফলে অনেক সুস্থ মানুষ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে সেই পরিমাণকে কমিয়ে আনার ফলে আজকাল আর সেই দূর্ঘটনা ঘটছেনা। এই লঘূকরণ পদ্ধতির নাম এ্যাটেনুয়েশন, যা অর্জন করতে অনেকদিনের ট্রায়াল এ্যান্ড এরর বা ভুল শোধরানো পর্যন্ত পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার পদ্ধতিতে গবেষণার প্রয়োজন হয়েছিল।
প্রসংগতঃ ইমিউনোথেরাপিতে ক্যান্সার চিকিত্সার ক্ষেত্রে একটি প্রচেষ্টার দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা চলে। ক্যান্সারজাতীয় টিউমারের ভিতর থেকে ইনজেকশনের সাহায্যে গৃহীত রস একই রোগীর দেহে প্রয়োগ করে ক্যান্সার রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা, যা সাফল্যলাভে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ হোমিওপ্যাথিতে একই পদ্ধতিতে ক্যান্সার রোগীর ক্ষত থেকে নিঃসৃত রস দিয়ে তৈরী ক্যান্সার টক্সিনকে প্রক্রিয়াজাত করে কার্সিনোসিন ও স্কিরিনাম নামক দুটি ওষুধ তৈরী করা হয়েছে যাকে সুক্ষ্মমাত্রায় সুস্বাদু করে মুখে খাইয়ে বংশগতভাবে প্রাপ্ত ক্যান্সার প্রবণতা কিংবা ক্যান্সার সদৃশ জটিল রোগপ্রবণতাকে প্রতিহত করা সম্ভব হচ্ছে। যদিও এই পদ্ধতিতে ক্যান্সার আরোগ্য করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া আধুনিক ইমিউনোথেরাপিতে বিসিজি টিকায় ব্যবহৃত যক্ষ্মারোগের জীবাণুকে ক্যান্সার আরোগ্য করার ব্যাপারে ইনজেকশনের দ্বারা প্রয়োগ করে অতি সীমিত সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত (তথ্য সূত্র নং ৩, পৃঃ নং ৯৫২)। অথচ হোমিওপ্যাথগণ যক্ষ্মার জীবাণু থেকে তৈরী টিউবারকুলিন নামক ব্যাকটেরিয়াল এন্ডোটক্সিন বা জীবাণু নিঃসৃত বিষকে সুক্ষ্মমাত্রায় সুস্বাদু করে মুখে সেবন করিয়ে অসংখ্য জটিল ইমিউনোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার থেকে সৃষ্ট রোগ যেমন হাঁপানি, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, জরায়ুর ফাইব্রয়েড, ওভারির সিষ্ট, ডায়াবেটিক গ্যাংগ্রীণ, বার্জারস ডিজিজ, সোরায়সিস, আপ্লাষ্টিক এ্যানিমিয়া, মেডুলোব্লাষ্টোমা (ব্রেন টিউমার), ইত্যাদি রোগকে অবলীলাক্রমে সুস্থ করে আসছেন (তথ্য সূত্র নং ৩, পৃঃ নং ৬৫৫ এবং তথ্য সূত্র নং ১২, পৃঃ নং …..) । হোমিওপ্যাথিক চিকিত্সায় অর্জিত এসব আরোগ্যের সংবাদ বিজ্ঞ এ্যালোপ্যাথিক চিকিত্সা বিজ্ঞানীদেরকে আস্থাশীল করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা বিষয়টি আদৌ তাদের কর্ণগোচর করা হচ্ছে না। এর ফলে একটি অতি সহজ এবং কম ব্যয়বহুল স্বাস্থ্য প্রযুক্তির সুবিধা থেকে মানবজাতি বঞ্চিত হচ্ছে। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, প্রায় সর্বপ্রকার জটিল রোগের পিছনে দায়ী হচ্ছে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার উত্স মজ্জার দুর্বলতাজনিত সৃষ্ট নানাবিধ বিশৃঙ্খলা। সেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে সক্ষম যে সকল উপাদান জগতে রয়েছে সেগুলোকে সুস্বাদু করে এবং সীমিত বা স্বল্পমাত্রায় ইনজেকশনের পরিবর্তে মুখে খাইয়ে প্রয়োগ করলে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ক্রিয়া অর্থাত মজ্জার শক্তিবর্ধন করে বিশৃঙ্খলা সমূহকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন প্রাচীন এবং আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের প্রযুক্তি সমূহের সমন্বয়সাধন, যা বয়ে আনতে পারে মানবজাতির জন্য অপার কল্যাণ, যেমনটি হয়েছে ওরস্যালাইনের বেলায়। উপরোক্ত প্রাচীন ও আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের তথ্য সমূহকে বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, সংক্রামক রোগের বেলায় যেমন টিকাদান পদ্ধতির দ্বারা দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে উজ্জীবিত করে রোগ প্রতিহত করা যায়, তেমনি পূর্বে বর্ণিত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার সুযোগে দেহের মধ্যে অযাচিতভাবে আশ্রয়প্রাপ্ত রোগবিষ বা এ্যান্টিজেনসমূহকে ধবংস করার জন্য বাছাই করা প্রাকৃতিক বিষাক্ত ভেষজ দ্বারা দেহের অস্থিমজ্জাকে এবং শ্বেতকণিকা সমূহকে উদ্দীপিত করে এবং সুস্থ দেহকোষের ক্ষতিসাধন না করে নির্ভূলভাবে কর্মক্ষম এ্যান্টিবডি বা রোগবিষনাশক রোগপ্রতিরোধ বাহিনী তৈরী করানো সম্ভব। এই কাজে ইনজেকশনের পরিবর্তে সূক্ষ্মমাত্রায় মুখে খাওয়ানোর উপযোগী, সুস্থ দেহে রোগ তৈরী করতে সক্ষম নানাবিধ বিষাক্ত উপাদানকে ব্যবহার করাই সর্বোত্তম উপায়।

Advertisements

পুনরালোচনা

পুনরালোচনা :

(ক) বিজ্ঞানী ফ্রয়েন্ড কর্তৃক উদ্ভাবিত পদ্ধতির আলোকে প্রাচীন চিকিত্সা পদ্ধতিসমূহের মূল্যায়নই পারে চিকিত্সা বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথের বাধা অতিক্রম করতে : আদিকাল থেকেই বিবিধ টক্সিক বা বিষাক্ত ভেষজ পদার্থ মুখে খাইয়ে রোগের চিকিত্সা চলে আসছিল। যে ধুতুরা বিষ মানুষকে উন্মাদ করতে পারে, সেই ধুতুরা দিয়ে উন্মাদ রোগীকে আরোগ্য করা হত আয়ূর্বেদ শাস্ত্রে। ঠিক তেমনি ভাবে ইউনানী, হোমিওপ্যাথি এবং এ্যালোপ্যাথিতে ব্যবহৃত শত শত টক্সিক বা বিষাক্ত প্রাকৃতিক উপাদানকে মুখে খাইয়ে কিভাবে যে রোগ আরোগ্য হত তার কোন সঠিক ব্যাখ্যা প্রাচীনপন্থী এবং আধুনিক এ্যালোপ্যাথিক চিকিত্সা বিজ্ঞানীরাও দিতে সক্ষম হননি।
১৯৪২ সালে জুলস, টি, ফ্রয়েন্ড নামে একজন আমেরিকান অণুজীববিজ্ঞানী জনতুর দেহে কিছু রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গে যক্ষ্মা রোগের জীবাণু মিশিয়ে ইনজেকশনের দ্বারা প্রয়োগ করে দেখলেন যে এর ফলে ঐ জনতুর দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায় এবং জন্তুটি রোগমুক্ত হয়। তিনি ঐ মিশ্র পদার্থের নাম দিলেন এ্যাডজুভ্যান্ট বা উদ্দীপক এবং রোগপ্রতিরোধ শক্তির বৃদ্ধিকে ইমিউনোপোটেনসিয়েশন বলে আখ্যায়িত করেন, যাকে বর্তমানে ইমিউনোমডুলেশন বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
তার এই প্রক্রিয়া মানবজাতির দেহে প্রয়োগ করে রোগ আরোগ্য করার চেষ্টা চলতে থাকে। কিন্তু জন্তুর দেহে প্রয়োগ করা সম্ভব হলেও ইনজেকশনের দ্বারা মানুষের দেহে যে কোন টক্সিক বা বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগ করাতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়ে থাকে।
বিজ্ঞানী ফ্রয়েন্ডের আবিষকৃত পদ্ধতিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত উপাদানের ব্যবহারের দ্বারা রোগপ্রতিরোধ শক্তিকে উদ্দীপিত করে রোগ আরোগ্য করার চেষ্টা ২০ বত্সর যাবত চালু থাকার পর এক সময় পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এর প্রধান কারণ ছিল, প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত বিষাক্ত উপাদান সমূহকে সুনির্দিষ্ট উত্তেজক (স্পেসিফিক এ্যাডজুভ্যান্ট) হিসাবে ব্যবহার করার কোন নীতিমালা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞানী ফ্রয়েন্ডের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও তার গবেষণালব্ধ আবিষ্কার চিকিত্সা বিজ্ঞানীদিগকে একটি তথ্য সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছিল, সেটি হচ্ছে দেহের জন্য বিষাক্ত উপাদান প্রয়োগ করলে দেহের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা উদ্দীপিত হয়ে উঠে এবং দেহে নতুনভাবে প্রবিষ্ট বিষকে ধবংস করতে গিয়ে দেহের ভিতর বিদ্যমান অনুরূপ বিষ সমুহকে ধবংস করে ফেলে।
বিজ্ঞানী ফ্রয়েন্ডের এই তথ্যটুকু ব্যবহার করে আমরা প্রাচীনকালে চিকিত্সা পদ্ধতি সমূহে ব্যবহৃত বিষাক্ত উপাদান সমূহের আরোগ্যকারী ক্ষমতার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পেতে পারি।
এই ব্যাখ্যাকে ব্যবহার করে ফ্রান্সের চিকিত্সা বিজ্ঞানী ডাঃ ও, এ, জুলিয়ান এবং আমেরিকার ডাঃ গার্থ বোরিক এম,ডি প্রমুখ হোমিওপ্যাথিক চিকিত্সা বিজ্ঞানীগণ মুখে খাইয়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন বিষাক্ত ওষুধ জাতীয় উপাদানকে এ্যাডজুভ্যান্ট বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার উত্তেজক হিসাবে আখ্যায়িত করে গিয়েছেন, যা এ্যালোপ্যাথিক চিকিত্সা বিজ্ঞানীদের মনযোগ এবং সমর্থন আদায় করতে ব্যর্থ হয়। এমনকি হোমিওপ্যাথির আরোগ্যের নীতিমালাকে ইমিউনোলজির সাহায্যে ব্যাখ্যা করার তাদের এই প্রচেষ্টাকে হোমিও জগত খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন বলে কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না।
বিজ্ঞানী ফ্রয়েন্ডের উদ্ভাবিত এ্যাডজুভ্যান্ট বা উদ্দীপক দ্বারা ইমিউনোমডুলেশন বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতির সাহায্যে রোগ চিকিত্সার প্রচেষ্টা কেবলমাত্র ক্যান্সার চিকিত্সার ক্ষেত্রেই পরীক্ষিত হচ্ছে, ক্যান্সার ব্যতীত অসংখ্য ইমিউনোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা দ্বারা সৃষ্ট রোগের বেলায় এর ব্যবহার নিয়ে খুব সামান্যই গবেষণা হয়েছে বলে জানা যায়।
বিজ্ঞানীরা ইনজেকশনের সাহায্যে প্রয়োগযোগ্য উপাদান অনুসন্ধান করতে করতে ইন্টারফেরণ, ইন্টারলিউকিন, কলোনী ষ্টিমুলেটিং ফ্যাক্টর (সি,এস,এফ), টিউমার নেক্রোসিস ফ্যাক্টর (টি,এন,এফ), এরিথ্রোপোয়েটিন, থাইমোপোয়েটিন ইত্যাদি সাইটোকাইন জাতীয় উপাদান আবিষ্কার করেন। কিন্তু মানুষের দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এসব উপাদানকে নিজ প্রয়োজন মত তৈরী করে দেহের ভিতর প্রয়োগ করে জীবাণু ধবংস করার উদ্দেশ্যে যে কাজগুলো করে থাকে, বাইরে থেকে ইনজেকশনের দ্বারা প্রয়োগ করে সেই সুফল পাওয়া তো দূরের কথা বরং প্রাণঘাতী ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ফলে ফ্রয়েন্ডের আবিষ্কৃত পদ্ধতি ইনজেকশনের দ্বারা প্রয়োগযোগ্য শুধুমাত্র গুটিকয়েক উপাদানের মধ্যেই যে সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছে তা নয় বরং সেগুলো ক্যান্সার চিকিত্সায় আশানুরূপ সুফল দিতেও সক্ষম হয়নি।
অথচ চিকিত্সা বিজ্ঞানের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যনত্ম ব্যবহৃত মুখে খাওয়ানোর উপযোগী শত শত টক্সিক বা বিষাক্ত প্রাকৃতিক উপাদান যে মানবদেহের ইমিউন সিষ্টেম বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উত্তেজিত করে সুপ্ত এ্যান্টিজেন বা রোগবিষ সমূহকে ধ্বংস করে ইমিউনোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার দ্বারা সৃষ্ট শত শত নন-ইনফেকশাস বা অসংক্রামক রোগসমূহকে আরোগ্য করে থাকে, এই মতবাদ যদি আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞান কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে তাহলে ফ্রয়েন্ডের পদ্ধতির সঠিক বাস্তবায়ন হতে পারে যা মানবজাতির জন্য বয়ে আনতে পারে অপার কল্যাণ। এই বিষয়টিকে লক্ষ্য করেই আমরা ইমিউনোলজির জ্ঞানের আলোকে প্রাচীন এবং আধুনিক চিকিত্সা পদ্ধতিগুলোকে বিচার বিশ্লেষণ করে একটি লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়েছি যার বিশদ বিবরণ এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে।
(খ) দেহকে বিষমুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদীভাবে রোগমুক্ত রাখতে ব্যর্থ হয়ে আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের গৃহীত রোগের দ্রুত উপশমের নীতিমালার কারণে সৃষ্ট জটিলতা থেকে মুক্তি লাভের একটি বিকল্প উপায় : একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, জ্বর, সর্দি, কাশি, অধিক ঘর্ম নিঃসরণ, শরীর ব্যথা, পাতলা পায়খানা ইত্যাদি রোগলক্ষণগুলো কষ্টদায়ক হলেও এগুলি আসলে বহিরাগত রোগজীবাণু বা ভাইরাসের সঙ্গে দেহের রোগপ্রতিরোধ বাহিনীর লড়াইয়ের ফলে সৃষ্ট কতগুলি প্রতিক্রিয়া মাত্র, যার দ্বারা দেহ বিষমুক্ত হয়ে রোগমুক্ত হয়ে থাকে। আধুনিক চিকিত্সায় ঐ সকল রোগ লক্ষণগুলোকে এলার্জি নাশক এ্যান্টিহিস্টামাইন এবং জ্বর ও ব্যথা নাশক প্যারাসিটামল, পাতলা পায়খানা রোধক ইমোটিল, আমাশয় রোধক মেট্রোনিডাজল (ফ্ল্যাজিল) ইত্যাদি ওষুধ দ্বারা দ্রুত কমিয়ে ফেলা হয়। এছাড়া চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা রিসেপ্টর নিয়ন্ত্রণ করে দেহের ভিতর চলমান নানাবিধ জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে প্রয়োজন মত নিয়ন্ত্রণ করার পথ খুঁজে বের করেছেন, যার নাম রিসেপ্টর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, যার বিসত্মারিত বিবরণ পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে।
উপরোক্ত পদ্ধতির দ্বারা অধুনা প্রচলিত প্রতিটি রোগের ওষুধ উদ্ভাবিত এবং ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব ওষুধ ক্রমাগত সেবন করতে হয়, কিন্তু এর দ্বারা দেহ বিষমুক্ত হয় না এবং পরিণতিতে রোগের জটিলতা বাড়তেই থাকে। এ ধরণের চিকিত্সার ফলে আমরা দেখতে পাই যে, দেহ আসলে বিষমুক্ত না হয়ে বরং ক্ষুধাহীনতা, বমিভাব ইত্যাদি সহকারে জন্ডিস জাতীয় রোগলক্ষণ প্রকাশ পায়। এর পর সাইটোটঙ্কি রিএ্যাকশন জনিত রক্তশূন্যতা এবং পরে ইমিউন কমপ্লেঙ্ রিএ্যাকশন, অটোইমিউনিটি এবং ইমিউনোডিফিশিয়েন্সি জনিত রোগ লক্ষণগুলো ধারাবাহিক ভাবে সৃষ্টি হতে থাকে। পরিণতিতে দেহে একধরণের দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থ ভাব চলতে থাকে যার কোন চিকিত্সা থাকে না।
অথচ প্রাচীন চিকিত্সা পদ্ধতিতে নানাবিধ ভেষজ ব্যবহার করে ঐ সকল রোগ লক্ষণগুলোকে সহ্যসীমার মধ্যে রেখে দেহকে বিষমুক্ত হবার সময় দেওয়া হতো। ইদানীং আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানেও ডায়ারিয়া রোগের চিকিত্সায় ওরস্যালাইন প্রয়োগ করার সময় পাতলা পায়খানা বন্ধ করার কোন ওষুধ সেবন করানোর বিষয়ে নিষেধ করা হয়।
তাই দেখা যায় যে, প্রাচীন চিকিত্সা পদ্ধতিতে বিবিধ ভেষজ ওষুধের দ্বারা উপরোক্ত রোগলক্ষণ সমূহকে দূর করলে দেহের রোগলক্ষণ মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি এক ধরণের প্রশান্তি লাভ ঘটতো, যা ওরস্যালাইন দ্বারা ডায়ারিয়া মুক্ত হওয়ার পর রোগীরা অনুভব করে থাকেন। আরোগ্যের এই প্রক্রিয়াকে প্রাচীনপস্থী চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হননি, কারণ তখন ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেনি, যার দ্বারা আজ সমগ্র বিষয়টির সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করা সম্ভব। দেহকে বিষমুক্ত না করে শুধুমাত্র রোগকষ্ট থেকে উপশমের কারণে দেহ বহিরাগত জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট বিষাক্ত পদার্থ (ব্যাকটেরিয়াল এক্সোটক্সিন এবং এন্ডোটক্সিন) এর পূঞ্জীভূত বিষের আখড়ায় পরিণত হয়, এ কথাটা আজ আমরা আধুনিক ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের কল্যাণে জানতে পারছি। দেহে সুস্থ শ্বেতকণিকা এবং শ্বেতকণিকার দ্বারা সৃষ্ট এ্যান্টিবডি এবং তার সাহায্যকারী কমপ্লিমেন্ট এর যৌথ বিষনাশক প্রক্রিয়ার ফলে দেহের হিউমরাল ও সেলুলার ক্ষেত্রে যে যৌথ রোগপ্রতিরোধ বাহিনীর আক্রমণাত্মক প্রক্রিয়া বিষমুক্ত করে দেহকে রোগমুক্ত করে রাখে তাকে সাহায্য করার জন্য রোগপ্রতিরোধ বাহিনীর জন্মস্থান মজ্জার শক্তিবৃদ্ধির লক্ষ্যে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা। এই প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে জন্ম নিয়েছে নানাবিধ সাইটোকাইন জাতীয় উপাদান। কিন্তু অস্থিমজ্জাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আশানুরূপ সাফল্য অর্জিত হয়নি আজো। ইমিউনোলজি চিকিত্সা বিজ্ঞানীদের এই প্রচেষ্টাকে সাহায্য করার জন্যই আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে অল্টারনেটিভ মেডিসিনের প্রাচীন প্রাকৃতিক চিকিত্সার পদ্ধতিকে কাজে লাগানো।
এই উদ্দেশ্যে ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের আবিষকৃত ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার উত্তেজক বা এ্যাডজুভ্যান্ট এর সাহায্যে ইমিউনোমডুলেশন বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে কার্যকর করার জন্য ব্যয়বহুল এবং জটিল সাইটোকাইনের ব্যবহারের পরিবর্তে প্রাচীন কালের বিষাক্ত ভেষজের ব্যবহারকে একটি নতুন পন্থায় সাজানো হয়েছে, যার দ্বারা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্রিয়ার হিউমরাল বা দেহরসগত, সেলুলার বা কোষগত এবং মেডুলার বা মজ্জাগত এই তিনটি ক্ষেত্রকেই একই সঙ্গে ক্রিয়াশীল এবং কর্মক্ষম করে তোলা সম্ভব হয়। এই ত্রিমুখী প্রক্রিয়ার দ্বারা আমরা আমাদের উদ্দেশ্যকে সফল করতে সক্ষম হয়েছি। যা এযাবত কোন একটি চিকিত্সা বিজ্ঞানই একক ভাবে অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। আমাদের এই নবউদ্ভাবিত পদ্ধতির দ্বারা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলাজনিত কারণে সৃষ্ট সব ধরণের রোগকে অত্যন্ত সহজে আরোগ্য করা সম্ভব হচ্ছে। এই পদ্ধতির ক্রিয়া একটু ধীরগতি সম্পন্ন হলেও এর ফল দীর্ঘমেয়াদী এবং দেহকে স্বনির্ভর করে তুলতে সক্ষম। চিকিত্সা বিজ্ঞানের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে এই পদ্ধতি অত্যন্ত কম ব্যয়বহুল এবং আদর্শ এবং সম্পূর্ণ পার্শ্বপ্রত্রিক্রিয়া মুক্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই পদ্ধতির অধিকতর বিকাশ এবং উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী। শুধুমাত্র সাময়িক রোগমুক্তি নয়, দেহকে এইচ,এল,এ’র দ্বারা সৃষ্ট রোগপ্রবণতা থেকে মুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদীভাবে ওষুধ নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করার মতো এক অবিশ্বাস্য পদ্ধতির জন্ম হয়েছে।
ফ্রান্সের হোমিও বিজ্ঞানী ডাঃ ও, এ জুলিয়ান কর্তৃক হোমিওপ্যাথি ও ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের সমন্বয়ে প্রবর্তিত ডাইনামাইজড মাইক্রো-ইমিউনোথেরাপির অনুসারে এই নবউদ্ভাবিত পদ্ধতির নামকরণ করা হয়েছে ‘হোমিওপ্যাথিক ইমিউনোমডুলেশন’। এই পদ্ধতিতে প্রাচীন ও আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের নীতিমালাকে ব্যবহার করে ইনজেশনের পরিবর্তে বাছাই করা একাধিক উদ্ভিজ্জ, প্রাণিজ, খনিজ, জীবাণুজ, রাসায়নিক এবং তেজস্ক্রিয় উপাদানকে সুস্বাদু করে স্বল্প ও সূক্ষমাত্রায় মুখে খাইয়ে পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রয়োগ করে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে দেহকে বিষমুক্ত করে রোগমুক্ত করার পদ্ধতিকে ব্যবহার করা হয়েছে।
(গ) বিশ্বের সকল চিকিত্সা বিজ্ঞানের সমন্বয়ে গঠিত রোগমুক্ত জীবনের নবতম ফর্মূলা: হোমিওপ্যাথিক ইমিউনোমডুলেশন :-
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে মানুষের দেহকে টক্সিন বা বিষমুক্ত করে রোগমুক্ত রাখার চেষ্টা চলছে আদিকাল থেকে। ঐ ক্ষমতার প্রধান উত্স হচ্ছে অস্থিমজ্জা, যার কাজ রক্তকণিকার জন্মদান করা। কোন কারণে অস্থিমজ্জার দুর্বলতা সৃষ্টি হলে দুর্বল রক্তকণিকার জন্ম হয় যার ফলে রোগ প্রবণতা বেড়ে যায়। কোন ওষুধের সাহায্যেই অস্থিমজ্জাকে স্থায়ীভাবে সুস্থ এবং সবল করা সম্ভব হচ্ছে না। অস্থিমজ্জার দুর্বলতা দূর করার উপযোগী যে কয়েকটি উপাদান আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলোর পরীক্ষা ক্যান্সারের মত জটিল রোগের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, তাই সেগুলো সাধারণ দীর্ঘমেয়াদী রোগের বেলায় এখনও কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়নি।
অথচ আয়ুর্বেদ, ইউনানী এবং হোমিওপ্যাথির মত প্রাচীন প্রাকৃতিক চিকিত্সা পদ্ধতিতে, এমন কি এ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত এ্যালোপ্যাথি চিকিত্সা পদ্ধতিতেও যে সকল ওষুধ ব্যবহারের দ্বারা যুগ যুগ ধরে অসংখ্য রোগীকে অনেক জটিল রোগ থেকে বিনা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদীভাবে মুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছিল সেগুলি ছিল সবই বিষাক্ত বা টক্সিক ওষুধ।
তখন কিন্তু বিজ্ঞানীরা জানতেন না যে, কেন রোগ চিকিত্সার জন্য বিষাক্ত উপাদান ব্যবহার করা হতো। তাই ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের বিকাশ লাভের পূর্বে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ‘বিষে বিষনাশ’ এবং হোমিওপ্যাথিতে ‘সমবিধান’ বা ‘লাইক কিওরস লাইক’ ইত্যাদি হাইপোথেটিক্যাল বা কাল্পনিক মতবাদের জন্ম হয়েছিল এবং এ্যালোপ্যাথি বিজ্ঞানীরা ওষুধের প্রতিক্রিয়াকে জীবাণু ধ্বংসকারী (সাইটোটক্সিক) ক্রিয়া হিসাবেই মনে করছিলেন।
আসলে ঐ সময় সকল চিকিত্সা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত টক্সিক বা বিষাক্ত পদার্থ যে রোগপ্রতিরোধ শক্তি (ইমিউন সিস্টেম) কে উত্তেজিত করে ইমিউন টলারেন্সের কারণে দেহে আশ্রয়প্রাপ্ত রোগ সৃষ্টিকারী রোগবিষ সমূহকে ধবংস করে রোগমুক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হত, সে কথাটির প্রমাণ পেতে বিজ্ঞানীদেরকে ১৯৪২ সালে বিজ্ঞানী ফ্রয়েন্ডের এ্যাডজুভ্যান্ট বা উদ্দীপক উপাদানের সাহায্যে ইউমিউনোপোটেনসিয়েশন বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার উত্তেজিতকরণ পদ্ধতির আবিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হত।
কিন্তু তার আগেই এ্যালোপ্যাথিক চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা জীবাণুনাশক এ্যান্টিবায়োটিক এবং রোগপ্রতিরোধক টিকাদান পদ্ধতি আবিষ্কারের পাশাপাশি রিসেপ্টর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির কল্যাণে মানুষকে অতি দ্রুত রোগকষ্ট থেকে মুক্তির সহজ পথের সন্ধান দিতে পেরেছিলেন। তাই ফ্রয়েন্ডের আবিষ্কারলব্ধ দেহকে বিষমুক্ত করার জটিল, অনিশ্চিত এবং রোগীদের জন্য কষ্টদায়ক পথের চাইতে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত সাইটোকাইনের পথের দিকে এগিয়ে চলেছিলেন।
কিন্তু বাইরে থেকে কৃত্রিমভাবে সরবরাহকৃত সাইটোকাইনের পথ নিশ্চিত সাফল্যের মুখ দেখাতে প্রায় ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিশৃঙ্খলার কারণে সৃষ্ট রোগসমূহের নিয়ন্ত্রণের জন্য ষ্টেরয়েডের সাহায্যে ইমিউনোসাপ্রেশন বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অবদমনের পথকেই আকড়ে ধরলেন। এযাবতকাল অর্গান ট্রান্সপ্লানটেশন বা অঙ্গসংস্থাপনের প্রয়োজনে ব্যবহৃত অবদমনের পথই বর্তমানে সর্বজনপ্রিয় পথ হিসাবে স্বীকৃতি পেল।
এছাড়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতা বা ইমিউনোডিফিশিয়েন্সির কারণে সৃষ্ট রোগের বেলায় ইদানীং বাইরে থেকে ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আই জি) সরবরাহ করে রোগসমূহকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে দু’ধরনের ওষুধই পাশাপাশি ব্যবহার করা হচ্ছে। ষ্টেরয়েডের দ্বারা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমানো হচ্ছে এবং পাশাপাশি ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আই জি) দিয়ে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
কিন্তু দেহকে বিষমুক্ত না করে ক্রমাগত দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ওষুধের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করার ফলে ইমিউনোলজি বিজ্ঞান বর্ণিত (১) হাইপারসেন্সিটিভিটি, (২) সাইটোটক্সিসিটি, (৩) ইমিউন কমপ্লেক্সিটি, (৪) অটোইমিউনিটি এবং (৫) ইমিউনোডিফিসিয়েন্সি, এই ৫টি প্রতিক্রিয়ার কারণে সৃষ্ট (১) এ্যালার্জি (২) রক্তশূন্যতা (৩) একজিমা, এ্যাজমা, কুষ্ঠ ইত্যাদি রোগ, (৪) ডায়াবেটিস (৫) ক্রমাগত রোগাক্রান্ত থাকা ইত্যাদি রোগগুলো পর্যায়ক্রমে মানুষকে আক্রমণ করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে এক সময় যখন আর ঐ সকল ওষুধগুলো কাজ করতে ব্যর্থ হয়ে যায় এবং দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে রাখার সুযোগে বহিরাগত ভাইরাসেরা বিনা বাধায় দেহ কোষের ডি,এন,এ’র পরিবর্তন সাধন করে ভাইরাল ডি,এন,এ তে রূপান্তরিত করে ফেলে, তখন সেই কোষগুলোই হয় ক্যান্সার কোষ, যার বৃদ্ধি ঘটতে থাকে অবলীলাক্রমে এবং সুস্থ মানব দেহটি ক্যান্সার কোষের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে আরোগ্যের বাইরে চলে যায়। সে সময় চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা ক্যান্সার কোষ ধবংস করার জন্য কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপি প্রয়োগ করেন যার দ্বারা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস হবার পাশাপশি অবশিষ্ট সুস্থ কোষগুলোও ধবংসপ্রাপ্ত হয়ে যায় এবং রক্ত কণিকা তৈরী করার প্রধান কেন্দ্রস্থল অস্থিমজ্জারও ধবংস সাধিত হয়। ফলে ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি সাময়িকভাবে কিছুদিন সুস্থ থাকার পর পুনরায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাহীনতার কারণে ক্যান্সারেই মারা পড়ে ।

তথ্যসূত্র

তথ্যসূত্র :

০১। বেসিক এ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমিউনোলজি-৪র্থ সংস্করণ – লেঞ্জ মেডিক্যাল পাবলিকেশনস
০২। ডেভিডসন্স প্রিন্সিপ্যালস এ্যান্ড প্র্যাকটিস অব মেডিসিন, ১৩ ও ১৫ তম সংস্করণ ।
০৩। বেসিক এ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজি – ৯ম সংস্করণ- বার্ট্রাম জি, ক্যাটজুং
০৪। ক্লিনিক্যাল হেমাটোলজি ইন মেডিক্যাল প্র্যাকটিস – জি, সি, ডি গ্রুচি।
০৫। পার্কস টেস্কটবুক অব প্রিভেনটিভ এন্ড সোস্যাল মেডিসিন – কে,পার্ক – ১৫তম সংস্করণ ।
০৬। ক্লিনিক্যাল মেডিসিন -কুমার এন্ড ক্লার্ক – ৪র্থ সংস্করণ ।
০৭। এ ট্রিটিজ অন মেটিরিয়া মেডিকা এন্ড থেরাপিউটিঙ্ – ডাঃ রাখাল দাস ঘোষ – হিলটন এন্ড কোঃ – ১৯৩৩ ইং।
০৮। মেটিরিয়া মেডিকা – ডাঃ উইলিয়াম হেল-হোয়াইট-লন্ডন-১৯৩৫ ইং।
০৯। চিরঞ্জীব বনৌষধি – আয়ুর্বেদাচার্য্য শিবকালী ভট্টাচার্য্য
১০। এ কম্পেন্ড অব দি প্রিন্সিপলস অব হোমিওপ্যাথি – গার্থ বোরিক এম, ডি,।
১১। ট্রিটিজ অন ডাইনামাইজড মাইক্রো – ইমিউনোথেরাপি – ডাঃ ও, এ, জুলিয়ান।
১২। ডিক্শনারী অব প্রাকটিক্যাল হোমিওপ্যাথিক মেটিরিয়া মেডিকা- ডাঃ জে, এইচ, ক্লার্ক এম, ডি।
১৩। ডিকশনারী অব হোমিওপ্যাথিক মেটিরিয়া মেডিকা – ডাঃ ও, এ, জুলিয়ান।
১৪। পকেট ম্যানুয়াল অব হোমিওপ্যাথিক মেটিরিয়া মেডিকা – ডাঃ উইলিয়াম বোরিক এম, ডি। প্রকাশক- বি, জেইন পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, ইন্ডিয়া
১৫। মেটিরিয়া মেডিকা অব নোসোডস্ – ডাঃ এইচ, সি এ্যালেন ।
১৬। মাসিক গণস্বাস্থ্য সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০০৬।
১৭। মেডিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি এন্ড ইমিউনোলজি – ডাঃ ওয়ারেন লেভিনসন। প্রকাশক- লেঞ্জ মেডিক্যাল বুকস্ ।
১৮। কুবিজ ইমিউনোলজি – ষষ্ঠ সংস্করন, প্রকাশক – ফ্রিম্যান এন্ড কোং