হোমিওপ্যাথির প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে আমাদেরকে জানতে হবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্য সকল শাখার চাইতে কোন বিষয়টি হোমিওপ্যাথিকে একটি সাহায্যকারী চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে।

আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাব যে, পৃথিবীতে মানবদেহে রোগের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে মানবদেহে প্রবিষ্ট রোগজীবাণুকে ওষুধের সাহায্যে ধ্বংস করলে জীবাণুকে দূর করা যায় কিন্তু জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট বিষাক্ত উপাদান দেহ থেকে বিতাড়িত করা সম্ভব হয় না। ঐসকল বিষাক্ত উপাদানকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এন্টিজেন বা রোগবিষ বলা হয়। ঐসকল বিষাক্ত উপাদান ক্রমাগত দেহে জমা হতে থাকে। যার ফলে দেহের আভ্যন্তরীন পরিবেশ ক্রমাগত দূষিত হয়ে যায়। এই দূষনের ফলে ক্রমশঃ অধিকতর শক্তিশালী জীবাণু এবং ভাইরাস মানবদেহের বিষাক্ত পরিবেশে প্রবেশ করার ক্ষমতা অর্জন করে। এই ক্রমবর্ধমান দূষনের কারণে সৃষ্ট অধিকতর শক্তিশালী রোগসমূহকে দমনের ক্ষমতা ব্যবহৃত ওষুধগুলো হারিয়ে ফেলছে। এই ক্রমবর্ধমান দূষণজনিত সৃষ্ট রোগ থেকে দেহকে মুক্ত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট বিষাক্ত উপাদানগুলোকে দেহ থেকে বহিষ্কৃত করার উপযোগী ওষুধের ব্যবহার করা। শুধুমাত্র রোগকষ্টকে দূরকরলেই চলবে না, দেহের আভ্যন্তরীন পরিবেশকে বর্জ্য নিঃসরন বা ডিটক্সিফিকেশন পদ্ধতির দ্বারা কলুষমক্ত বা পরিচ্ছন্ন করে তুলতে হবে। প্রচলিত কোন চিকিৎসাতেই এই কাজটি করা সম্ভব হয় না যতক্ষন পর্যন্ত না চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলো দেহের জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট বিষগুলোকে এন্টিবডির সাহায্যে দেহ থেকে বহিষ্কৃত করে ফেলতে পারবে। এ কাজটি করতে সক্ষম একমাত্র হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতি যার দ্বারা দেহ কেবলমাত্র রোগ কষ্ট থেকে মুক্তি লাভই করে না বরং হোমিওপ্যাথিক ওষুধের সঙ্গে দেহমধ্যস্থ বিষাক্ত উপাদানগুলো মিশ্রিত হয়ে এমন এক পদার্থ সৃষ্টি করে যা দেহের বর্জ নিঃসরনের পথ দিয়ে দেহ থেকে নির্গত হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার ফলে দেহের আভ্যন্তরীন পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা লাভ করে থাকে। হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ব্যবহারের ফলে অর্জিত এই বিশেষ উপকার সম্বন্ধে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে অবগত নন। আধুনিক ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের দ্বারা আবিষ্কৃত “এন্টিজেন – এন্টিবডি” সংক্রান্ত জ্ঞান দ্বারা আমরা বিষয়টি সম্বন্ধে জানতে পেরেছি। হোমিওপ্যাথিতে ব্যবহৃত সুক্ষ্মমাত্রার ভেষজের সঙ্গে দেহস্থ বিষাক্ত উপাদানের মিশ্রনের ফলে এই প্রক্রিয়াটি ঘটে থাকে। অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত ওষুধের দ্বারা এই প্রক্রিয়াটি ঘটতে পারে না। হোমিওপ্যাথি দ্বারা অর্জিত এই সুফলের ফলে একজন রোগী প্রত্যেকটি রোগ থেকে আরোগ্য লাভের পর অধিক মাত্রায় সুস্থতা অর্জন করে থাকে যা অন্য কোন চিকিৎসায় অর্জন করা সম্ভব হয় না।
যেসব রোগী শৈশব থেকে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের দ্বারা চিকিৎসা লাভ করে থাকে তারা ক্রমাগত অধিকতর সুস্থদেহের অধিকারী হতে থাকে। এই বিষয়টি আমরা দীর্ঘদিন যাবত চিকিৎসা প্রাপ্ত রোগীদেরকে পর্যবেক্ষন করে উপলব্ধি করতে পেরেছি। এর ফলে আজন্ম হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতিতে চিকিৎসাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বয়স বৃদ্ধিজনিত কারণে জটিল রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয় না । অর্থাৎ মানুষের স্বাভাবিক রোগ প্রবণতার ব্যাপারটি থেতে একজন হোমিও চিকিৎসা গ্রহণকারী ব্যাক্তি মুক্তিলাভ করতে পারে। ফলে বয়সবৃদ্ধি জনিত জটিল রোগ যথা উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবিটিস ইত্যাদি থেকে মুক্ত থেকে অধিক বয়স পর্যন্ত আয়ুষ্কালপ্রাপ্ত ব্যাক্তিরা সুস্থ জীবনের অধিকরী হতে পারেন। বিগত শতাব্দিতে আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব হোমিওপ্যাথি কর্তৃক পরিচালিত গবেষণা দ্বারা আলোচ্য বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়েছিল।
ফ্রান্সের ডাঃ ও এ জুলিয়ান ইমিউনোলজি বিজ্ঞানের সঙ্গে হোমিওপ্যাথিকে সংযুক্ত করে “ডাইনামাইজড মাইক্রো ইমিউনোথেরাপি” নামে আখ্যায়িত করে এক নতুন চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্ম দিয়েছিলেন যার দ্বারা ইমিউনোলজি বিজ্ঞানে ইনজেকশন দ্বারা প্রয়োগকৃত ওষুধের পরিবর্তে মুখে খাওয়ানোর পদ্ধতিকে প্রচলন করা হয়, তার পদ্ধতি অনুসরণ করে বর্তমানে এ্যালোপ্যাথি বিজ্ঞানে ব্যবহৃত সাইটোকাইন জাতীয় ওষুধের মৌখিক ব্যবহারের প্রচলন করা হয়েছে। এই অত্যাধুনিক ওষুধের ব্যবহার এ্যালোপ্যাথি বিজ্ঞানে ব্যবহৃত ইনজেকশন দ্বারা প্রয়োগকৃত ওষুধের পাশর্^প্রতিক্রিয়াকে দূর করে এবং হোমিওপ্যাথিক ওষুধের কর্মক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন মাত্রার সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছে।
ইদানিংকালে আমরা ক্যান্সার, এইডস এর মতো প্রানঘাতী রোগের পর হেপাটাইটিস, ইবোলা, চিকুনগুনিয়া ইত্যাদি ভাইরাস ঘটিত রোগ নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা যে সমাধান খুজে পাচ্ছেন না তাদেরকে আমরা একটি শুভ সংবাদ দিতে চাই যে, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাপ্রাপ্ত ব্যাক্তিদের অর্জিত শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে উপরোক্ত জটিল রোগগুলো সহজে আক্রমণ করতে পারে না এবং আক্রমণ করলেও সহজেই আরোগ্য করা সম্ভব হয় ।
এদিক দিয়ে হোমিওপ্যাথি প্রকৃতপক্ষে একটি কমপ্লিমেন্টারী এবং অল্টারনেটিভ মেডিসিন হিসাবে এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার দিকে পরিপূরক হিসাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে যা বিশ^ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কম ব্যয়বহুল করে তুলতে সক্ষম। তাই চিকিৎসা ব্যবস্থার সকল শাখারই উচিত হোমিওপ্যাথিকে সহযোগী চিকিৎসা হিসাবে গ্রহণ করা।
 
Advertisements